বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডারঃ চরমপন্থী আবেগ

bipolar mood disorder disease

মে মাসের কোন এক শনিবার সকাল। আমার ভাষায়, “ব্যর্থ সকাল”।

যেসব সকালে আমাকে বাসা থেকে চা না খেয়ে বের হতে হয়, সেসব সকাল আমার কাছে ব্যর্থ৷ এবং এধরনের ব্যর্থ সকালে কেন জানি দফায় দফায় মেজাজ খারাপ হয়৷ রাস্তায় বের হয়ে একটা সিএনজি ধরে বললাম “যাবেন শাহবাগ?” সিএনজিওয়ালা হ্যা-না কিছুই না বলে হাত দিয়ে দেখাল, “তিনশ টাকা”। সেই ছিল আমার প্রথম দফার মেজাজ খারাপ৷

সিদ্ধান্ত নিলাম আজ আর কোন সিএনজিকে জিজ্ঞেসই করবনা, সোজা একটা রিকশা নিব! দুই তিন রিকশাকে জিজ্ঞেস করার শেষে এক রিকশাওয়ালা রাজি হল- দেড়শ টাকায় শাহবাগ মোড়। কিন্তু রিকশায় উঠার পর মনেহল এই রিকশাওয়ালা ভদ্রলোকের জীবনে কোন তাড়া নেই। ভয়ানক ধীর গতিতে রিকশা চালাচ্ছেন আর পকেটে রাখা মোবাইলের লাউডস্পিকারে গান বাজছে,” প্রেমের বাত্তি জ্বালাইয়া, আমারে ফালাইয়া, কেন গেলা ঢাকা।”

আফসোস, ব্যক্তিগত তাড়াহুড়ার কারনে এই অসাধারন গানটা মনযোগ দিয়ে শোনা গেল না। ভদ্রলোককে বললাম, ” মামা একটু তাড়াতাড়ি চালান, আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে!” উনি কি বুঝল জানিনা, তবে রিকশার গতি মনেহল আগের চেয়ে আরো স্লো হয়ে গেল। ছেলেছোকরাদের টিকটক ভিডিওর মতন এই স্লো মোশনের রিকশা যখন শাহবাগ মোড়ে থামল, অলরেডি তখন আমি পয়তাল্লিশ মিনিট লেট।

পয়তাল্লিশ মিনিট প্লাস শাহবাগ থেকে আউটডোর পর্যন্ত যেতে আরো প্রায় দশমিনিট, টোটাল পঞ্চান্ন মিনিট লেটের বোঝা মাথায় নিয়ে আউটডোরে গিয়ে বসার কিছুক্ষন পরে দ্বিতীয় দফায় মেজাজ খারাপ হল৷ একের পর এক রোগীর মন খারাপ, ঘুমের সমস্যা, কানে গায়েবী আওয়াজ আর মাথার তালু জ্বলার মাঝে আরেক বিরাট সমস্যা- আউটডোরের স্ট্যান্ডফ্যানের ঘড়ঘড় শব্দ। মে মাসের ভয়ানক গরমে এই যন্ত্র নামক যন্ত্রনাটা না পারছি সামনে থেকে সরাতে, না পারছি সহ্য করতে। এভয়ডেন্স-এভয়ডেন্স কনফ্লিক্ট বোধহয় একেই বলে!

যাক, কনফ্লিক্টের গল্প নাহয় আরেকদিনের জন্য থাক। আমার আজকের গল্পের মূল চরিত্র মূলত সেদিনের একজন রোগী যার বয়স আনুমানিক ২৫-৩০ এর মধ্যে, হালকা পাতলা গড়ন। পরনের শার্টটা মনেহচ্ছে একেবারেই নতুন। রংটাও বেশ কটকটে। ওনার আগের রোগী চেয়ার ছেড়ে উঠতেই লম্বা একটা সালাম দিয়ে চেয়ারে বসে, হাত দুটো টেবিলে রেখে উসখুস করতে লাগলেন।

— জ্বি বলুন কী সমস্যা নিয়ে এসেছেন?

— ম্যাডাম, খুব রাগ হচ্ছে ইদানীং! বাসার সবাই বলে আমি নাকি পাগল হয়ে গেছি।

— কেন! এ কথা বলবে কেন? রাগ হলেই কি কেউ পাগল হয়?

— আমিও তো এটাই বলি ম্যাডাম! (পেশেন্ট এবার বেশ উত্তেজিত) ওরা আমার কোন মতামতের গুরুত্ব দেয়না। সামান্য কিছু একটা বলতে গেলেই বলে আমি নাকি বেশি কথা বলি!

— আচ্ছা আচ্ছা। ঠান্ডা হোন। আপনি আমাকে এটা বলুন যে, দিনের বেশিরভাগ সময় আপনার মনটা কেমন থাকে?

— কেমন আর থাকবে ম্যাডাম? সারাক্ষনই অস্থির লাগে। তার মধ্যে পরিবারে কেউ আমার মতামতের গুরুত্ব দেয়না। এজন্য আরো রাগ লাগে। আমি বলেছি ব্যবসা করব, তারা আমাকে ব্যবসা করতে দিবেনা! বলে তুই হইলি ইন্টার ফেল, তুই কিসের ব্যবসা করবি? আর কত পাগলামি করবি??

— এবার আমি নড়েচড়ে বসলাম। ব্যবসা করতে দিবেনা কেন? কিসের ব্যবসা করতে চান আপনি?

— এক্সপোর্ট ইম্পোর্ট।

— কী এক্সপোর্ট ইম্পোর্ট করবেন?

— সেইটা এখনো ভাবিনাই। ভাবার সময়ই তো পাইনা! মেজাজ থাকে অত্যন্ত খারাপ!

— ব্যবসা যে করবেন, ব্যবসার জন্য তো টাকা লাগে।টাকা আছে আপনার? এখন কোন চাকরি করেন?

— জ্বি ম্যাডাম কাচা টাকা হাতে নাই তবে আমিতো ধনী পরিবারের সন্তান, আমার জন্য টাকা জোগাড় করা কোন ব্যাপারই না! আর আমি চাকরি করব কেন?? চাকরি মানে লোকের চাকর হয়ে থাকা! আমি জন্মাইসি ব্যবসায়ী হতে!

— আচ্ছা আচ্ছা। ঠিক আছে। ঘুম কেমন হয় আপনার?

— ঘুম ব্যাপার না ম্যাডাম। ঘুম ঠিক আছে। তবে ইদানীং ব্যবসাটা নিয়ে একটু বেশি চিন্তা ভাবনায় থাকি তাই বেশি ঘুমানো যাচ্ছেনা৷ কিন্তু আমার কোন সমস্যা হচ্ছেনা। তাছাড়া বেশি ঘুমালে স্বাস্থ্য নষ্ট হয়।

— ইদানীং কি বেশি বেশি টাকাপয়সা খরচ করছেন?

— জ্বি ম্যাডাম। খরচাটা একটু বেশিই হচ্ছে।

–কেন?

— জানিনা ম্যাডাম। চায়ের দোকানে বিল হইছে তিন হাজার টাকা!

— বেশি বেশি দান ক্ষয়রাত করছেন?

— জ্বি ম্যাডাম, জ্বি! দান করতে আমার খুব ভাল লাগে৷ দান করে কেউ কখনো গরীব হয়না ম্যাডাম৷ তাছাড়া আমি এক্সপোর্ট-ইম্পোর্ট কোম্পানির প্রধান, যারা গরীব তাদেরকে দান ক্ষয়রাত করা আমার মানবিক দ্বায়িত্ব!

— শার্টটাও তো নতুন কিনেছেন মনেহচ্ছে৷ ইদানীং কি খুব বেশি ফিটফাট থাকতে ভাল লাগে?

— ইদানীং না ম্যাডাম। আমি ছোট বেলা থেকেই “ফ্যাশনেবল।” ফ্যাশন জিনিসটা আমার খুব লাইক।

এইটুকু বলার পরেই যা বোঝার আমি বুঝে গেলাম। আমার রোগী মূলত ম্যানিক আর রোগের নাম “বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার।”

বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার কি?

বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার- নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে এটি “মুড” বা মেজাজের রোগ। বাইপোলার অর্থ ” দ্বি-প্রান্তিক”। আরেকটু সহজ করে বলি। ধরা যাক, আমাদের আমাদের আবেগ হচ্ছে একটি সরলরেখা। সরলরেখার যেমন দুটি প্রান্ত বা পোল থাকে, আবেগেরও দুটি প্রান্ত থাকে। এক প্রান্তে থাকে অসম্ভব ফুর্তি বা আনন্দ, আরেকপ্রান্তে থাকে মারাত্মক মনখারাপ বা বিষন্নতা।

আমরা যারা মানসিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ, তারা ধরে নিতে পারি এই সরলরেখার মোটামুটি মাঝামাঝিতে আমাদের মনের অবস্থান। কিন্তু যারা বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার নামক অসুখে আক্রান্ত, তাদের মনের অবস্থান থাকে যেকোন এক প্রান্তে, মাঝামাঝিতে না। এজন্য তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয় প্রচন্ড ফূর্তিতে থাকেন, অথবা থাকেন ভয়ানক বিষন্নতা নিয়ে। কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য আরেকরকমের মেজাজ দেখা যায়, সেটি হল ভীষনরকমের বিরক্তি, রাগ বা অস্থিরতা যেটি কিনা আমার এই রোগীর ছিল।

বাইপোলার ডিজঅর্ডার একটি এপিসোডিক রোগ

বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার একটি এপিসোডিক রোগ৷ এই রোগের রোগীদের সমগ্র জীবনব্যাপী গড়ে প্রায় ১০ টি এপিসোড আসতে পারে। দুটি এপিসোডের মধ্যবর্তী সময়ে রোগী সম্পূর্ন সুস্থ থাকেন। ভিন্ন ভিন্ন এপিসোডে রোগীর লক্ষন ভিন্ন হতে পারে৷ সেক্ষেত্রে, লক্ষনভেদে এপিসোডগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়-

  • ম্যানিক এপিসোড
  • ডিপ্রেসিভ এপিসোড।

ম্যানিক এপিসোডে রোগীর মনে থাকে অস্বাভাবিক ফূর্তি অথবা চরম বিরক্তি। এবং সেই সাথে থাকবে মুড এর সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন লক্ষন। অন্যদিকে ডিপ্রেসিভ এপিসোডে রোগীর মন থাকবে বিষন্ন এবং তার সাথে সংগত লক্ষনসমূহ। বলা হয়ে থাকে যে, বাইপোলার রোগটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শুরু হয় ডিপ্রেসিভ এপিসোড দিয়ে।

তবে বিষন্নতা বা ডিপ্রেশন আমাদের দেশের মানুষের কাছে খুব একটা গুরুত্ব পায়না৷ পরিবারের কোন সদস্য যখন বিষন্নতায় ভোগেন, অন্য সদস্যরা সেটাকে “একটু মন খারাপ” ভেবে নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত হয়ে যান। যার ফলে বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডারের এই প্রথম এপিসোড অনেকসময়ই আমাদের জানার বাইরে থেকে যায়৷ বিষয়টি নজরে আসে তখনই যখন পেশেন্টের ম্যানিক এপিসোড আসে, পেশেন্টের মাত্রাতিরিক্ত ফূর্তি, বিরক্তি বা আগ্রাসী আচরন যখন অসহনীয় মাত্রায় চলে যায়, তখন পরিবারের লোকজন হয়ত তাকে প্রথমবারের মত ডাক্তারের কাছে নিয়ে আসেন।

বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার কাদের হয়?

গবেষনায় দেখা গেছে, প্রতি ১০০ জনে ১ জনের এই রোগটি হতে পারে। ১৮-২১ বছর বয়সের মধ্যে রোগটি হওয়ার প্রবনতা সবচেয়ে বেশি। লিংগভেদে নারী-পুরুষ আক্রান্তের হার সমান।

বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার কেন হয়?

অন্যান্য মানসিক রোগের মত এই রোগটিরও কোন নির্দিষ্ট কারন পাওয়া যায়নি৷ এই রোগে মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রনকারী বিভিন্ন রাসায়নিকের তারতম্য হয়ে থাকে কিন্তু এই তারতম্য কেন হয় তার কোন সুনির্দিষ্ট কারন পাওয়া যায়নি। তবে গবেষনায় কিছু “রিস্ক ফ্যাক্টর” উঠে এসেছে, যেই ফ্যাক্টরগুলো থাকলে রোগটি হওয়ার আশংকা বেড়ে যায়। এগুলোর মধ্যে বংশগত ইতিহাস, জীবনে চাপ সৃষ্টিকারী কোন নেতিবাচক ঘটনা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ।

বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার রোগের লক্ষনসমূহ

যেহেতু রোগটি এপিসোডিক, তাই এই রোগের লক্ষনগুলো নির্ভর করে রোগী বর্তমানে কোন এপিসোডে আছে তার উপর৷ উদাহরনস্বরূপ, ম্যানিক এপিসোডের রোগীর মনে যেহেতু অস্বাভাবিক ফূর্তি থাকে, তার কাজে কর্মেও সেই ফূর্তি ভাবটাই প্রকাশ পায়৷ তাদের পরনের কাপড় হয় খুবই চকচকে, রংগিন কিন্তু অসামঞ্জস্যপূর্ন (যেমন চৈত্র মাসের গরমে স্যুট,টাই কিংবা জ্যাকেট)৷

রোগীর মুখে থাকে হাসি, কথা বলতে বলতে শুরু করে দিতে পারে গান। তাদের মাথায় সার্বক্ষনিক চিন্তার ট্রেন ছুটতে থাকে, যেটা প্রকাশ পায় তাদের কথায়। অল্প কথায় তারা কিছু শেষ করতে পারেনা, এমনকি যে প্রসংগে কথা বলছে সেটাও শেষ না করেই হয়ত অন্য প্রসংগে চলে যাচ্ছে। তাদের কথার মাঝখানে কেউ বাধা দিলে তারা প্রচন্ড বিরক্ত হয়, আর রোগীর মুড যদি হয় আমার রোগীর মত আগে থেকেই বিরক্ত, তাহলে তো কথাই নেই। এছাড়া অন্যান্য লক্ষনগুলো হচ্ছে-

  • ম্যানিক রোগী নিজের সম্পর্কে তার যোগ্যতার চেয়ে অতিরিক্ত উচ্চ ধারনা পোষন করে থাকে। উদাহরনস্বরূপ, রোগী যদি ম্যানিক হবার পূর্বে একজন দিনমজুর বা সাধারন একজন গৃহিনী হয়ে থাকেন, ম্যানিক ফেজে যাবার পরে তিনি নিজেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী বা বিখ্যাত কোন ফিল্মস্টার ভাবতে পারেন।

    আমার রোগীর কথাই ধরা যাক। এইচএসসি ফেইল এবং ব্যবসায়ীক নূন্যতম ধারনাবিহীন আমার রোগী চাচ্ছেন এক্সপোর্ট-ইম্পোর্ট এর ব্যবসা করতে। কিভাবে করবেন, মূলধন কোত্থেকে আসবে সে বিষয়ে কিন্তু তার কোন ধারনা নেই অথচ পরিবার কেন তার মতে সায় দিচ্ছেনা এটা নিয়ে উনি খুবই রাগান্বিত।

    আবার এরা যেহেতু নিজেকে খুব বড় কিছু ভাবতে থাকে সেহেতু অনেকসময় ব্যবসা বা ক্যারিয়ারে বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে যেটা পরবর্তীতে তার নিজের জন্যই বড়সড় ক্ষতির কারন হয়ে দাড়ায়।

  • নিজেকে বড় ভাবার পাশাপাশি এই রোগীদের অতিরিক্ত টাকা পয়সা খরচ, দান ক্ষয়রাত, অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটা করার প্রবনতাও দেখা যায়।

    উদাহরণস্বরূপ, মার্কেটে গিয়ে হয়ত একই রংয়ের, একই ডিজাইনের, একই কাপড় তারা একসাথে তিন-চারটা কিনে ফেলল, দান করতে গিয়ে হয়ত নিজের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বা টাকাপয়সা দিয়ে দিল।

    মোটকথা, বেহিসেবী খরচ করে প্রয়োজনে তারা নিঃস্ব হয়ে যাবেন, তবুও তাদের খরচের হাত কখনো ছোট হবে না।

  • খরচের পাশাপাশি আরো কিছু বিষয় যেমন, খাওয়াদাওয়া, যৌন চাহিদা ইত্যাদি বিভিন্ন জৈবিক চাহিদাগুলোও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকগুন বেড়ে যায়।

    কেউ কেউ আবার অস্বাভাবিক হারে ধর্ম-কর্ম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন যেটা কিনা তার দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে ব্যহত করে।

  • শুরুতে একবার বলেছি, ম্যানিক রোগীদের মাথায় সার্বক্ষনিক চিন্তার ট্রেন ছুটতে থাকে। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এরা এত বেশি চিন্তিত থাকেন যে তাদের ঘুমের পরিমান স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কমে যায়।

    দেখা যায়, পুরো রাতে তারা হয়ত মাত্র দুই থেকে তিনঘন্টা ঘুমাচ্ছেন কিন্তু এই কম ঘুমানোকে তারা কোন সমস্যা তো মনে করেনই না বরং এরচেয়ে বেশি ঘুমালে তাদের কাজের ক্ষতি হয় বলে দাবি করেন।

  • সবশেষে, এদের এইসকল যেকোন কাজে কেউ বাধা দিলে বা মতের বিরোধীতা করলে এরা ভয়ানক আগ্রাসী হয়ে ভাংচুর কিংবা অন্যকে মারধোর পর্যন্ত করতে পারে।

এতো গেল ম্যানিক এপিসোডের কথা। এবার আসা যাক ডিপ্রেসিভ এপিসোডে। সংক্ষেপে বলতে গেলে ডিপ্রেসিভ এপিসোড আর কিছুই না, একজন ডিপ্রেশনের রোগীর যে লক্ষনগুলো থাকে, বাইপোলার ডিজঅর্ডারের ডিপ্রেসিভ এপিসোডেও ঠিক একই লক্ষন থাকতে পারে। মূলত এখানে রোগীর মুড থাকে ডিপ্রেসড বা বিষন্ন।

দৈনন্দিন কোন কাজে আগ্রহ না পাওয়া, আগে যে কাজ করতে ভাল্লাগত সেই কাজেও আনন্দ না পাওয়া, খাওয়াদাওয়া/ ঘুমের ব্যঘাত কিংবা অতিরিক্ত খাওয়া/ঘুম, কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা বা সবকিছু ভুলে যাওয়া, নিজেকে অযোগ্য, অপ্রয়োজনীয় ভাবতে থাকা এবং খুব মারাত্মক পর্যায়ে বেচে থাকার আগ্রহ চলে যাওয়া বা আত্মহত্যার চিন্তা বা চেষ্টা করা, এসবকিছুই থাকতে পারে একজন বাইপোলারের ডিপ্রেসিভ ফেজের রোগীর মাঝে।

বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার রোগের ভবিষ্যতঃ

বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার রোগের ভবিষ্যত বা ইংরেজীতে আমরা যাকে বলি “প্রগনোসিস” বলতে গেলে প্রথমেই যে কথাটি বলতে হয় সেটি হল এই রোগটি বারবার ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে। এবং গবেষনা অনুযায়ী এই সম্ভাবনা প্রায় ৯০ শতাংশ। সেই সাথে খুব ছোট বয়সে রোগটি শুরু হওয়া, পূর্বে বংশের কারো এই রোগ থাকা, এই রোগের সাথে অন্য কোন মানসিক রোগ “কো-মরবিডিটি” হিসেবে থাকা ইত্যাদি রোগটির প্রগনোসিসের ক্ষেত্রে খারাপ হিসেবে গন্য হয়।

তবে রোগী যদি নিয়মিত ওষুধ খান এবং ডাক্তারের ফলোআপে থাকেন তবে তিনি অনেকাংশেই সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন। সেক্ষেত্রে ওষুধের পাশাপাশি আরো কিছু বিষয় মাথায় রাখতে হবে-

  • রোগী যেন কখনো খুব চাপের মধ্যে না থাকে। অতিরিক্ত চাপ রোগের রিল্যাপ্স ঘটায়।
  • রোগীর পরিমিত ঘুম নিশ্চিত করতে হবে। ঘুমের পরিমান কমে গেলেও রোগটি ফিরে আসার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
  • কোনরকমের নেশা করা থেকে রোগীকে বিরত রাখতে হবে, নেশা জাতীয় দ্রব্যাদি এই রোগের ফিরে আসা ত্বরান্বিত করে।

সর্বোপরি ডাক্তারের পরামর্শ এবং পরিবারের লোকের সহযোগিতা পেলে একজন বাইপোলারের রোগীও আর দশজন সাধারন মানুষের মত জীবনযাপন করতে পারেন।

উপরের আলোচনা থেকে আপনাদের মনে এধরনের প্রশ্ন আসতে পারে, “আচ্ছা, আমিও তো অনেক খরচ করি, আমারো তো রাগ বেশি, আমিও কম ঘুমাই, তাহলে কি আমিও ম্যানিক?” উত্তর হল, “না।”

এখানে একটা বিষয় বুঝতে হবে যে সাইকিয়াট্রিতে কোন মানসিক সমস্যাকে তখনই মানসিক রোগ বলা হয় যখন কিনা ওই সমস্যাটি ওই ব্যক্তির কিংবা তার পরিবার পরিজন, আশেপাশের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যহত করে। আপনি যদি দেখেন কোন একটি লক্ষন, যেটিকে আপনি সমস্যা মনে করছেন, সেটি আপনার বা আপনার চারপাশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কোথাও কোন সমস্যা করছেনা তবে আপনাকে অভিনন্দন! সাইকিয়াট্রির ভাষায় আপনার কোন মানসিক রোগ নেই।

বাইপোলার রোগের গল্প আজ এইটুকুই। কিন্তু রোগের গল্প করতে করতে তো আমার রোগীর গল্পই শেষ হলনা! এবার তবে রোগীর গল্পে ফিরে যাই…

— আচ্ছা ম্যাডাম, আপনি এই যে এতগুলা প্রশ্ন করলেন, আমার কিন্তু এইসব কোনই সমস্যা নাই ম্যাডাম। শুধু রাগটা বেশি। এর অবশ্য কারন আছে। পরিবারের লোকদের অবুঝ আচরন! নয়তো অযথা রাগ করার মানুষ তো আমি না! আপনি ম্যাডাম আমার রাগটা একটু কমানোর ওষুধ দেন..

— দিচ্ছি। আগে আপনি একটু শান্ত হয়ে বসেন।

(এই বলে আমি প্রেসকিপশন লেখা শুরু করলাম। লেখার মাঝখানেও রোগী নানান কথা বলছিল, সেসব আমার অত ভাল মনে নেই..)

— নিন, ওষুধ লিখে দিয়েছি। কিন্তু ওষুধ লিখলেই তো শুধু হবেনা, আপনাকে নিয়মিত খেতেও হবে৷ সাথে তো কাউকে নিয়ে আসেননি৷ এরপর থেকে অবশ্যই পরিবারের একজনকে সাথে নিয়ে আসবেন..

— জ্বি জ্বি..

— আর শোনেন, এত রাগারাগি করা যাবেনা। আর আপনি খরচ করবেন ভাল কথা, কিন্তু তাই বলে শুধু চা খেয়েই বিল বানাবেন তিন হাজার টাকা, এটা কেমন কথা!

— জ্বি ম্যাডাম এটা আসলেও কিভাবে যে হল ম্যাডাম আমি নিজেও বুঝে পাইনা। তবে মানুষকে দিতে কিন্তু মন লাগে ম্যাডাম। আমি আবার মনের দিক থেকে..

— থামুন। আমি আর সময় দিতে পারছিনা। আপনি এবার উঠুন।

পেশেন্ট উঠেই যাচ্ছিল, হঠাৎ কি মনে করে আবার একটু কাছে এগিয়ে এসে গদগদ ভংগিতে বলল..

— ইয়ে মানে, ম্যাডাম!

— বলুন!

— ম্যাডাম কি ভিজিট নেন??

— কিসের ভিজিট!!

— না মানে, চা-পানি খাইলেন একটু…. দেই???

  • 4
    Shares
  • Dr.Md.Abdus Sobhan says:

    Excellent,I appreciate this type of nice writing in begali.Go ahead.

  • >
    Scroll to Top