শিশুর মানসিক বিকাশঃ যা জানা প্রয়োজন

Cognitive development

ধরুন, আপনার দেড় বছরের বাচ্চাটিকে আপনি অনেকগুলো খেলনা দিয়ে বসিয়ে রেখেছেন, বাচ্চা খেলবে এই ভেবে। কিন্তু আপনি দেখলেন সে খেলছে তো না-ই উলটো প্রত্যেকটা খেলনা হাতে নিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে ছুড়ে ফেলছে। স্বাভাবিকভাবেই আপনি বাচ্চার উপর মহা বিরক্ত হলেন।

তবে এই বিরক্তি শুধু আজকের ঘটনার জন্য না। আগেও আপনি খেয়াল করেছেন বাচ্চা প্রায়ই হাতের কাছে যা পায়, জানালা দিয়ে নিচে ফেলে দেয়। আপনি মনে মনে ভাবেন, আপনার বাচ্চা এত দুষ্টু কিভাবে হল! এখনই এই অবস্থা, বড় হলে না জানি কি করে!

প্রথমত, আপনি নিশ্চিত থাকেন যে আপনার বাচ্চার এই যে কর্মকান্ড, এটা স্রেফ দুষ্টুমি না। এর সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ব্যাখা রয়েছে। দ্বিতীয়ত,বাচ্চা বড় হবার পর আর এই ঘটনা ঘটাবে না সে ব্যাপারেও নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। বড়জোড় আর ৬ মাস, তারপরই হয়ত আপনার বাচ্চা নতুন কিছু শুরু করবে আর আপনার জীবনে যুক্ত হবে নতুন দুশ্চিন্তা! আর এই সবকিছুই আপনার সন্তানের মানসিক বিকাশের অংশ।

মানসিক বিকাশের মূলনীতি

সুইস সাইকোলজিস্ট জা পিয়াজে (Jean Piaget) এর মতে, একটি শিশু জন্মের পর থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত মানসিক বিকাশের বিভিন্ন ধাপের মধ্যে দিয়ে যায় এবং একটি ধাপ পুরোপুরি সম্পন্ন হওয়ার পরেই কেবলমাত্র সে পরবর্তী ধাপে প্রবেশ করতে পারে৷

পিয়াজে’র মতে, মানসিক বিকাশের প্রাথমিক স্তরটি গঠিত হয় কিছু সুনির্দিষ্ট মানসিক প্রক্রিয়া বা ‘Mental Schema‘ এর মাধ্যমে। এই Schema হচ্ছে অনেকটা কম্পিউটার সফটওয়্যারের মত, যার মাধ্যমে একজন মানুষ প্রকৃতির বিভিন্ন ঘটনাবলী (কম্পিউটারের ডেটা স্বরূপ) ধারন, বিশ্লেষণ এবং সেই অনুযায়ী পরিচালনা করতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি ছয় মাস বয়েসী বাচ্চার হাতে একটি বল ধরিয়ে দিন সেই বলটা সে প্রথমেই মুখে ঢুকাবে৷ এর কারন হচ্ছে জন্মগতভাবে একটি শিশু মাতৃদুগ্ধ পানের যে Mental Schema নিয়ে জন্মায় তার ফলস্বরূপ পরবর্তীতে তার মুখের কাছে বা হাতে যা দেয়া হয় সেটি সে মুখে নিয়ে চুষতে থাকে।

তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে যে বড় হতে হতে বাচ্চার এই স্বভাবটা আর কেন থাকছে না? এর কারন বাচ্চার মানসিক বিকাশ তো আর একটি স্তরে থেমে থাকছেনা, পিয়াজে’র তত্ত্ব অনুসারে তা বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন স্তর পার হয়ে অবশেষে পূর্ন মানসিক পরিপক্কতা পায়। এবং প্রতিটি স্তরে তাদের Mental Schema’র কিছু পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা সংযোজন ঘটে; পিয়াজে যার নাম দিয়েছেন Assimilation এবং Accomodation.

Assimilation হচ্ছে ইতোমধ্যে বিদ্যমান স্কিমার সাহায্যে কর্ম সম্পাদন। অর্থাৎ উপরের উদাহরনে যে বাচ্চাটা বল নিয়ে মুখে পুরল, সেখানে সে তার বিদ্যমান স্কিমা (মাতৃদুগ্ধ পান) কে কাজে লাগিয়ে সমস্যার সমাধান করল। আবার আরেকটি বাচ্চা হয়ত চিড়িয়াখানায় উড়ন্ত কাঠবিড়ালিকে ‘পাখি’ বলে চিহ্নিত করল কারন তার মনের মধ্যে পাখির একটি স্কিমা রয়েছে এইরকম যে ‘যা উড়তে পারে সেটাই পাখি।’

অন্যদিকে Accomodation হচ্ছে বিদ্যমান স্কিমার কিছুটা পরিবর্তন বা সংযোজন অথবা সম্পূর্ন নতুন কোন স্কিমা তৈরী করন। যেমন, উপরের উদাহরনের দ্বিতীয় বাচ্চাটি উড়ন্ত কাঠবিড়ালিকে সরাসরি ‘পাখি’ না বলে যদি বলে ‘লেজওয়ালা পাখি’ তবে সেটি হবে স্কিমার সংযোজন। আবার প্রথম বাচ্চাটির ক্ষেত্রে বলের জায়গায় যদি একটা বড়সড় কাগজের বাক্স রাখা হয় যেটি সে মুখে নিতে পারছেনা, তখন সে হয়ত বাক্সটি ঠেলতে শুরু করবে (নতুন স্কিমা তৈরী)।

মোটকথা পুরো ব্যাপারটিকে এককথায় এভাবে ব্যাখ্যা করা যায় যে, আমরা যখন কোন নতুন কম্পিউটার কিনি তখন অনেক সফটওয়্যার তার মধ্যে অলরেডি ইন্সটল্ড থাকে (Mental Schema)। পরবর্তীতে সেইসব সফটওয়্যারের সাহায্যে আমরা সরাসরি কিছু কাজ করতে পারি ( Assimilation), আবার কোন কোন সময় কাজ করতে গেলে সফটওয়্যার আপডেট করা লাগে (Accomodation)।

মানসিক বিকাশের স্তরসমূহ

মেন্টাল স্কিমাকে ভিত্তি হিসেবে ধরে জা পিয়াজে মানসিক বিকাশকে চারটি স্তরে ভাগ করেছেন।

সেন্সরিমোটর (Sensorimotor) স্টেজঃ জন্মের পর থেকে ২ বছর বয়স পর্যন্ত এর ব্যপ্তি। সেন্সরিমোটর নাম থেকেই বোঝা যায় এই স্টেজে শিশু তার সেন্সরি (Sensory) অর্থাৎ ইন্দ্রিয় এবং মোটর (motor) অর্থাৎ মুভমেন্টের সাহায্যে বিভিন্ন বস্তু সম্পর্কে ধারনা লাভ করে৷ একারনেই এই বয়েসী বাচ্চারা খেলনা পেলে হাত বাড়িয়ে ধরতে চায়, মুখে নিয়ে স্বাদ নিতে চায় আবার ছুড়ে ফেলে শব্দ শুনতে চায়। সেই সাথে এই বয়েসী বাচ্চারা অন্যদের অনুকরন করা শুরু করে। যেমন বাবা মাথা দোলালে সেও একইভাবে মাথা দোলাতে চায়, একই রকম মুখভঙ্গি করার চেষ্টা করে।

আরেকটি ইন্টারেস্টিং জিনিস হচ্ছে ‘অবজেক্ট পারমানেন্স’ (Object Permanence)। জন্মের পর থেকে মোটামুটি ৬ মাস বয়স পর্যন্ত বাচ্চার অবজেক্ট পারমানেন্স থাকেনা৷ এই বয়েসী বাচ্চারা ভাবে “What can’t be seen, doesn’t exist” অর্থাৎ, যা দেখা যায়না তার আসলে অস্তিত্বই নেই! এজন্য এই বাচ্চাদের চোখের সামনে আপনি যতক্ষন কোন বস্তু রাখবেন, ততক্ষন সেই বস্তুর প্রতি তাদের আগ্রহ থাকবে৷ যখনই সরিয়ে ফেলবেন তারা সেটি বেমালুম ভুলে যাবে। একটিবারের জন্যও তারা বস্তুটি খুজতে চাইবেনা কিংবা খুজে না পেলে কান্নাও করবেনা৷

ধীরে ধীরে বাচ্চার বয়স যখন ৮-১১ মাস, তখন তার মধ্যে অবজেক্ট পারমানেন্স ডেভেলপ করে। এই বয়েসী বাচ্চাদের চোখের সামনে থেকে আপনি সহজে কিছু সরাতে পারবেন না, সরিয়ে ফেললে তারা কান্না করবে এবং পুনরায় খুজে পেতে চাইবে।

প্রি-অপারেশনাল (Preoperational) স্টেজঃ এই স্টেজের সময়সীমা ২-৭ বছর বয়স পর্যন্ত৷ পিয়াজে ‘অপারেশনাল’ বা ‘অপারেশন’ বলতে আসলে বুঝিয়েছিলেন, যৌক্তিক চিন্তাভাবনা (logical thinking)। তার মানে দাঁড়ায় যে এই প্রি-অপারেশনাল স্টেজটা হল যেখানে এই যুক্তি ব্যাপারটা থাকবেনা। অর্থাৎ এই স্টেজে বাচ্চা কোন ঘটনার যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে পারেনা এবং কোন নিজে যুক্তি বোঝেওনা। লজিকাল থিংকিং এর এই অনুপস্থিতি কিছু বিষয় দ্বারা বোঝা যায় যেমন-

১. ইগোসেন্ট্রিজম (egocentrism)ঃ প্রি অপারেশনাল স্টেজের বাচ্চারা ভাবে পৃথিবীর সবকিছু আবর্তিত হয় তাকে ঘিরে; সে যেটা চিন্তা করে বা তার জন্য যেটা ঠিক সেটাই সবার জন্য ঠিক।

উদাহরণস্বরূপ, অনেকসময় অনেক বাচ্চাকে দেখবেন জেদ করছে যে তার নিজের ছোট্ট চেয়ার বা ছোট্ট সাইকেলটাতে তার বাবা-মাকেও বসতে হবে৷ কিন্তু অতটুকুন একটা চেয়ার বা সাইকেলে যে অতবড় একজন মানুষ বসতে পারেনা, এই বিষয়টা সে বুঝতে পারেনা৷ তার ধারনা যেহেতু সে ওটাতে বসতে পারে বা তার যেহেতু জিনিসটা প্রিয় তাই তার বাবা মাকেও ওটাতে বসতে হবে৷

২. ল অফ কনজারভেশন (law of conservation)ঃ ধরুন আমি আপনার সামনে একটি কাচের গ্লাসে দুইশ মিলি পানি ঢাললাম। এরপর দ্বিতীয় আরেকটি গ্লাসেও সমপরিমান পানি ঢাললাম কিন্তু দ্বিতীয় গ্লাসটি প্রথম গ্লাসের তুলনায় বেশ চিকন এবং লম্বা। স্বাভাবিকভাবেই দ্বিতীয় গ্লাসের পানির উচ্চতা প্রথম গ্লাসের পানির উচ্চতার চেয়ে বেশি দেখাবে৷ এরপর আমি যদি আপনাকে জিজ্ঞাসা করি, আচ্ছা এই দুইটি গ্লাসের কোনটিতে বেশি পানি আছে? আপনি কি উত্তর দেবেন? নিশ্চয়ই বলবেন যে কোনটাতেই বেশি নেই, দুটাতেই সমপরিমাণ পানি আছে। কারন আপনি জানেন যে কেবলমাত্র স্থান, কাল, পাত্র পরিবর্তন করলেই কোন জিনিসের গঠন বা পরিমান পরিবর্তন হয়না।

কিন্তু আমি যদি প্রিঅপারেশনাল স্টেজের কোন বাচ্চাকে এই প্রশ্নটা করতাম, সে আমাকে দ্বিতীয় গ্লাসটি দেখিয়ে বলত, ‘এটাতে বেশি পানি আছে।’ এমনকি আপনি যদি তার সামনে যদি প্রথম গ্লাসের পানিই আবার দ্বিতীয় গ্লাসে ঢালেন তাহলেও সে একই কথা বলবে। অর্থাৎ তার মধ্যে এই ‘ল অফ কনজারভেশন’ ডেভেলপ করেনি৷

কংক্রিট অপারেশনাল (Concrete operational) স্টেজঃ ৭-১১ বছর বয়েসের বাচ্চারা এই স্টেজের অন্তর্ভুক্ত। এই স্টেজে বাচ্চার মধ্যে যৌক্তিক চিন্তাভাবনা আসা শুরু করে। তবে এর মধ্যেও কিছুটা সীমাবদ্ধতা থেকে যায়। কারন চিন্তা বা থিংকিং হয় দু’রকম- 

Concrete thinking অর্থাৎ যেসব বস্তু চোখের সামনে দেখা যায় সেসব বিষয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা।

Abstract thinking অর্থাৎ চোখে দেখা যায়না এমন বিমূর্ত বিষয়ে (যেমন রাগ, দুঃখ, ভালবাসা) চিন্তা করার ক্ষমতা।

এই কংক্রিট অপারেশনাল স্টেজে বাচ্চার কংক্রিট বিষয়ে লজিকাল চিন্তাভাবনা তৈরী হয় যার ফলে বাচ্চার ইগোসেন্ট্রিজম ধীরে ধীরে চলে যায়, ল অফ কনজারভেশন ডেভেলপ করে, এবং বাচ্চা কোন বস্তুর বাহ্যিক গুনাগুন সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ধারনা অর্জন করে৷

ফরমাল (Formal) অপারেশনাল স্টেজঃ ১১ বছর থেকে শুরু করে জীবনের পরবর্তী সময়কাল হচ্ছে ফরমাল অপারেশনাল স্টেজ। এই স্টেজেই একজন মানুষ শিশু থেকে কিশোর বয়েসে পদার্পন করে আর সেই সাথে তার চিন্তাভাবনাও বড়দের মত হতে থাকে। কংক্রিট থিংকিং এর সাথে যুক্ত হয় এবস্ট্রাক্ট থিংকিং, ফলস্বরূপ মনে মনে কোন হাইপোথিসিস তৈরি ও তার বিচার বিশ্লেষন করা এবং বিভিন্ন মানবীয় আবেগ, অনুভুতি সম্পর্কে ইত্যাদি ধারনা জন্মায়।

অর্থাৎ একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের চিন্তার জগতে প্রবেশ করার শুরুটা হচ্ছে এই ফরমাল অপারেশনাল স্টেজ।

একটা জিনিস মনে রাখা প্রয়োজন, জা পিয়াজে’র এই স্টেজগুলোতে যে বয়সের রেঞ্জ দেয়া হয়েছে এই রেঞ্জের ক্ষেত্রে কোন কড়াকড়ি নিয়ম নেই। যে বাচ্চার মানসিক বিকাশ খুব ভাল, সে হয়ত এক স্টেজ থেকে পরবর্তী স্টেজে খুব দ্রুত যেতে পারবে। আবার যার বিকাশ কিছুটা ধীরে, সে হয়তো অন্যদের চেয়ে একটু দেরিতে পৌছুবে৷

তবে দ্রুত হোক বা দেরিতে, প্রত্যেক শিশুই প্রতিটা স্টেজের ভেতর দিয়ে তার পূর্ন মানসিক বিকাশ অর্জন করে, এটিই পিয়াজে বলে গেছেন৷

কেন জানবেন?

আপনার মনে হয়ত প্রশ্ন আসতে পারে জা পিয়াজে’র এত কঠিন কঠিন তত্ত্ব জেনে আপনার কি লাভ? আচ্ছা লাভের ব্যাপারে নাহয় একটু পরেই চিন্তা করলেন। তার আগে একটা বিষয় দেখুন, আমরা বাবা-মা’রা সবাই আমাদের বাচ্চাদের ফিজিক্যাল ডেভেলপমেন্ট সম্পর্কে কমবেশি জানি। কোন বয়েসে বাচ্চার দাত ওঠে, বাচ্চা কখন বসবে, কখন দাড়াবে এগুলো সম্পর্কে আমরা সবাই সচেতন। এবং বাচ্চার শারিরীক এই বিকাশ সম্পর্কে আমরা যত বেশি জানি ঠিক ততটাই কম জানি বাচ্চার মানসিক বিকাশ সম্পর্কে৷ আর তাইতো এক বছরের বাচ্চা খেলনা ছুড়লে কিংবা তিন বছরের বাচ্চা তার সাইকেলে বসতে জেদ করলে আমরা বিরক্ত হই।

হ্যা এটা সত্যি যে অনেক বাচ্চার আচরনগত সমস্যা থাকে, যে সমস্যা প্রতিকারের জন্য অবশ্যই প্রফেশনাল হেল্প দরকার। কিন্তু আপনি বাচ্চার সমস্যাজনক আচরনকে তখনই চিহ্নিত করতে পারবেন যখন তার স্বাভাবিক আচরন সম্পর্কে আপনার জানা থাকবে। ইনফ্যাক্ট জা পিয়াজে নিজেও কিন্তু তার তিন সন্তানকে পর্যবেক্ষন করে কগনিটিভ ডেভেলপমেন্টের এই তত্ত্বটি দিয়েছিলেন। 

Each time one prematurely teaches a child something he could have discovered himself, that child is kept from inventing it and consequently from understanding it completely.

Jean Piaget

তাই আজকের পর থেকে আপনি আপনার সন্তানকে বাধা না দিয়ে তার স্বাভাবিক আচরনগুলো করতে দিন, সন্তানের সুন্দর মানসিক বিকাশের সহায়ক হোন আর উপভোগ করুন তার শৈশব।

  • 117
    Shares
  • Dr.Brishty says:

    অনেক অজানা কে জানলাম।
    ধন্যবাদ 💓

  • Noor E Asfia says:

    As salamu Alaikum apu. Very much helpful writeup. May Allah bless you. Keep going by the grace of Almighty.

  • >
    Scroll to Top