করোনায় বাড়তি সতর্কতাঃ সচেতনতা না ওসিডি?

covid-19-and-ocd

সালাম সাহেবের মেজাজ অত্যন্ত খারাপ। ঘরভর্তি মেহমান বসে আছে৷ করোনা শুরু হবার পর থেকে সালাম সাহেব এতদিন পর্যন্ত নিজে কারো বাসায় যাননি, কাউকে ইনভাইটও করেননি৷ বাইরে থেকে ঘরে যাই আসে, বাজার সদাই, সব মাস্ক আর গ্লাভস পড়ে একটা একটা করে জীবানুনাশক স্প্রে দিয়ে পরিষ্কার করে ভিতরে নেন। কিন্তু আজকে তার স্ত্রীর জন্মদিন উপলক্ষে ‘সারপ্রাইজ’ দিতে প্রায় হাফ ডজন শালা-শালী এসে বসে আছে।

ওনার স্ত্রী সেলিনা বেগমকেও ব্যাপারটায় বেশ খুশি মনে হচ্ছে। সালাম সাহেব বোঝেন না, মানুষের কি বিন্দুমাত্র কান্ডজ্ঞান নেই? উপরন্তু ঘরে ঢুকেই তার মেজো শালা “দুলাভাইইই” বলে একদফা কোলাকুলি করে নিল। উনি সাথে সাথেই বাথরুমে ঢুকে শাওয়ার নিয়ে নিয়েছেন৷ এখন আবার একটু আগে ওনার বড় মেয়ে লিনা এসে ওনাকে ডেকে গেল। সবাই নাকি এখন কেট কাটবে। ছেলেমেয়েগুলোও হয়েছে তাদের মায়ের মতন৷ কোন কান্ডজ্ঞান নেই..

“বাবা তুমি এখনো আসছো না?”

সালাম সাহেবের চিন্তায় ছেদ পড়ল। কিছু না বলে চুপ করে তাকিয়ে রইলেন মেয়ের দিকে। লিনা আবার বলল,

-“কি হয়েছে বাবা?”

— “আমি না গেলে হয়না?”

– “মানে? মা’র জন্মদিনের কেক কাটব তোমাকে ছাড়া?”

— “কেক কাটাকাটি এসব বাচ্চাদের কাজ। তোরা বাচ্চা মানুষ, তোরা থাকলেই তো হয়।”

লিনা এবার চোখমুখ শক্ত করে ফেলল। কঠিন গলায় বলল,

–” শুধু শুধু কেন মিথ্যা বলছ বাবা? আমি জানি তুমি কেন আসতে চাচ্ছোনা। এবং আমার ধারনা তুমি একজন অসুস্থ মানুষ। তোমার ডাক্তার দেখানো উচিত।”

– “ডাক্তার দেখানো উচিত মানে? আমার কি হয়েছে!”
সালাম সাহেব অবাক।

— ডাক্তার দেখানো উচিত মানে মানসিক রোগের ডাক্তার দেখানো উচিত। তুমি গত ৬ মাস ধরে কারো বাসায় যাওনা, কারো সাথে মেশনা। কেউ বাসায় এলেও নিজের ঘরে বসে থাকো। ভুলেও বাইরে থেকে এসে কেউ তোমার ঘরে পা দেয়ামাত্রই তুমি আতকে ওঠো! এগুলো কি তোমার কাছে স্বাভাবিক মনে হয়? করোনা নিয়ে টেনশন আমাদের সবারই আছে বাবা৷ কিন্তু তাই বলে তুমি যা করছো সেটা কি বাড়াবাড়ি না?

সালাম সাহেব ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। লিনা একটু দম নিয়ে বলল,

“তোমার ওসিডি রোগ হয়েছে বাবা। আমার একটা বান্ধবী আছে। ওর এই রোগটা আছে। এবং ও যা যা করে, তুমিও তাই তাই করছ। তোমাকে আমি একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাব বাবা..”

এমন সময় ওইঘর থেকে ডাক পড়ল। লিনা চলে গেল।

লিনা চলে যাওয়ার পর সালাম সাহেব অনেক্ষন চুপচাপ বসে রইলেন। মেয়েটা এগুলো কী বলে গেল তাকে? সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে নিয়ে যাবে মানে? উনি তো পাগল না! উনি শুধু সবাইকে করোনা থেকে নিরাপদ রাখতে চান, নিজেও নিরাপদ থাকতে চান। এটা কি খারাপ কিছু? কেন সবাই এত বিরক্ত হয় তার উপর? সালাম সাহেবের মন অসম্ভব খারাপ হয়ে গেল।

সালাম সাহেবের কি আসলেও ওসিডি আছে? চলুন জানার চেষ্টা করি। তবে এই উত্তর জানতে হলে আগে আমাদের জানতে হবে ওসিডি কী।

ওসিডিঃ

ইংরেজি OCD শব্দের পূর্নাঙ্গ বিশ্লেষন- Obsessive Compulsive Disorder. অর্থাৎ, এখানে দুইটি অংশ আছে- ১. অবসেশন    ২. কমপালশন

অবসেশন (Obsession): অবসেশন শব্দটি আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে খুব ব্যবহার করি। যেমন, প্রেমিকার প্রতি অবসেশন, কাজের প্রতি অবসেশন, সৌন্দর্যের প্রতি অবসেশন। অর্থাৎ কোন একটি বিষয় নিয়ে একেবারে মগ্ন হয়ে থাকা। অন্যদিকে ওসিডিতে অবসেশন বলতে বুঝানো হয়েছে ” recurrent and persistent thoughts, urges or images” যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় “বাধ্যতামূলক চিন্তা, ছবি বা তাড়না”৷ অর্থাৎ, ওসিডি রোগীর মাথায় কোন একটি চিন্তা বারবার আসতে থাকে, যেটি কিনা একেবারেই অযাচিত বা অমূলক চিন্তা, রোগী নিজেই সেটা বুঝতে পারেন এবং বুঝতে পারেন বলেই তিনি চান এই অযাচিত চিন্তা আসা বন্ধ করতে, এর জন্য বহু চেষ্টাও করেন কিন্তু কোন লাভ হয়না। যার ফলে রোগীর প্রচন্ড মানসিক কষ্ট হয়।

কমপালশন (Compulsion) : 

অবসেশন থেকে সৃষ্ট মানসিক কষ্ট থেকে বাচতে রোগী তখন অন্য একটি কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন যেই কাজকে আমরা বলি “compulsion” বা “বাধ্যতামূলক আচরন।” আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে compulsion এর পরিবর্তে করে থাকেন avoidant behaviour।

একটা উদাহরণ দিলেই বিষয়টি সহজভাবে বোঝা যাবে। যেমন, ধরা যাক একজন রোগীর ময়লা নিয়ে অবসেশন আছে। সারাক্ষনই তার মাথায় চিন্তা আসতে থাকে, এই বুঝি হাতটা ময়লা হয়ে গেল কিংবা শরীরে ময়লা লেগে গেল। এটা হচ্ছে তার obsession. এই অবসেশনকে আমরা বলি “obsessional thought about dirt and contamination“।

যদিও রোগী কিন্তু বুঝতে পারেন তার এই চিন্তাটা একবারেই অমূলক, তার হাতে বা শরীরে কোনই ময়লা নেই, তারপরও এই চিন্তাটা মাথা থেকে দূর করতে পারেন না। ফলাফল, চিন্তা থেকে বাচার জন্য তিনি হাত ধোন৷ তিনি মনে করেন একবার হাত ধুয়ে ফেললেই তো আর চিন্তা থাকল না কিন্তু বাস্তবতা হল এই যে তিনি যতই হাত ধোন না কেন, ময়লার চিন্তা তার বারবারই আসে এবং বারবারই তিনি হাত ধুতে থাকেন৷ এখানে এই হাত ধোয়াটা হল তার compulsion.

আমি উদাহরণ হিসেবে এখানে obsessional thought কে ব্যবহার করেছি, এর বাইরেও অবসেশন হিসেবে আসতে পারে কোন ছবি অথবা তাড়না, শুরুতেই সেটা বলেছি।

ছবির ক্ষেত্রে রোগীর চোখের সামনে অনাকাঙ্ক্ষিত কোন ছবি ভেসে ওঠে যেমন খুব ভয়ংকর বা অশালীন কোন ছবি (obsession) এবং এই ছবি তাড়ানোর জন্য সে তখন বেশি বেশি দোয়া পড়তে থাকে (compulsion)। তেমনি তাড়না বা impulse এর ক্ষেত্রে হুট করে কিছু একটা করে ফেলতে ইচ্ছা করে যেমন, দা-বটি দেখলেই মনে হয় এটা নিয়ে এক্ষুনি নিজের গায়ে বসিয়ে দেই, ছাদে গেলেই মনে হয় এক্ষুনি ছাদ থেকে একটা লাফ দেই। এবং এই urge থেকে বাচার জন্য রোগী হয়ত একসময় রান্নাঘর বা ছাদে যাওয়াই বন্ধ করে দেয় (avoidant behaviour)।

কাদের হয়?

ওসিডি রোগটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অল্প বয়সেই শুরু হয়, সাধারনত বিশ বছরের পূর্বেই৷ ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের হওয়ার হার সামান্য বেশি। বাচ্চাদেরও ওসিডি হতে পারে৷

কেন হয়?

ওসিডি হওয়ার কারন হিসাবে খুব নির্দিষ্ট কোন কিছুকে দায়ী করা যায়না। তবে গবেষনায় দেখা গেছে, মস্তিষ্কে ওসিডি সার্কিট বলে একটি সার্কিট আছে, সেই সার্কিটে গোলমাল হলে কিংবা বংশের অন্য কারো এই রোগ হওয়ার ইতিহাস থেকে থাকলে রোগটি হওয়ার সম্ভাবনা অনেক গুন বেড়ে যায়।

ওসিডির লক্ষনসমূহঃ

ওসিডি একটি চিন্তাবাতিক রোগ। যেহেতু ভিন্ন ভিন্ন মানুষের চিন্তা ভিন্নরকম, সেহেতু ওসিডির লক্ষনও মানুষের চিন্তার বৈচিত্র‍্যে বৈচিত্র্যময়। যেমন, বাচ্চাদের ক্ষেত্রে বাবা-মা বা কাছের কারো ক্ষতি হবার চিন্তা, বয়সন্ধিকালে সেক্সুয়াল অবসেশন আবার বড়দের ক্ষেত্রে ময়লা নিয়ে, ধর্ম নিয়ে বা বারবার চেক করার অবসেশন বেশি দেখা যায়।

আবার জাতি, ধর্ম, পরিবেশভেদেও ওসিডির ভিন্নতা দেখা যায়। যেমন, আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষই ধর্মভীরু৷ তাই অবসেশনাল থটের কম্পোনেন্ট হিসেবে ‘religious obsession’ টা পশ্চিমাদের চেয়ে আমাদের দেশে অনেক বেশি দেখা যায়। যেমন, ওযু করতে গেলে বারবার ওযু করতে থাকা, কিংবা ওযু বাদেও অন্য যেকোন কিছুই ধুতে গেলে নিদেনপক্ষে তিনবার ধোয়া ( যেহেতু ওযু করার সময় আমরা প্রত্যেকটা স্টেপ তিনবার করি তাই পেশেন্টের মাথায় অযাচিতভাবে চিন্তা আসতে থাকে তিনবার না ধুলে কোনকিছু পরিষ্কার হয়না), নামাজে দাড়ালেই ধর্ম নিয়ে আজেবাজে চিন্তা আসা ইত্যাদি।

অবসেশনাল থটের আরো কিছু উদাহরন-

Pathological doubts: কোন একটি কাজ করার পর বারবার মাথায় আসা যে কাজটি বোধহয় ঠিকভাবে সম্পন্ন হয়নি ফলশ্রুতিতে সেটি বারবার চেক করা ( যেমন, তালা লাগিয়ে বারবার তালা চেক করতে যাওয়া, চুলা বন্ধ করার পরও বন্ধ হয়েছে কিনা সেজন্য বারবার চেক করা।)

Somatic Obsessions: অসুখবিসুখ নিয়ে অযাচিত চিন্তা আসা কিংবা নিজের শরীরের কোন অংগকে ত্রুটিযুক্ত মনে হওয়া।

Aggressive Obsessions: ধারালো কোন বস্তু (ছুরি, কাচি) দেখলেই নিজে বা অন্যকে আঘাত করতে ইচ্ছা হওয়া, ঘরভর্তি মানুষের সামনে হঠাৎ অশালীন কোন শব্দ বলে ফেলা।

Sexual Obsessions: বিকৃত যৌন চিন্তা কিংবা যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা যায়না (বাবা, মা, ভাই, বোন) এমন কারো প্রতি বারবার যৌন চিন্তা আসা, বাচ্চাদের প্রতি যৌন চিন্তা আসা।

Hoarding: নিতান্ত অপ্রয়োজনীয় জিনিস জমিয়ে রাখার প্রবনতা।

Need for symmetry : যেকোন কিছু ( বইখাতা, আসবাবপত্র) সবসময় একই ছকে গুছিয়ে রাখার প্রবনতা এবং এর সামান্য হেরফের হলেই প্রচন্ড অস্বস্তি হতে থাকা।

অবসেশনের এরকম হাজারো উদাহরন দেয়া যায়, যেহেতু মানুষের চিন্তার কোন নির্দিষ্ট গন্ডি নেই। সেক্ষেত্রে শুধু একটা কথা মনে রাখলেই চলবে- “নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অযাচিত কোন চিন্তা বারবার মাথায় আসা এবং সেটি ওই ব্যক্তির জন্য মানসিকভাবে খুব পীড়াদায়ক হওয়া”- এটিই অবসেশন।

বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ওসিডি শনাক্ত করা বেশ কঠিন। কারন বাচ্চারা তাদের অবসেশনের ব্যাপারটা কাউকে বোঝাতে পারেনা, নিজেরাও বুঝে উঠতে পারেনা। এই অদ্ভুত অভিজ্ঞতাকে তারা অনেকসময় এভাবে ব্যাখ্যা করে- ” ও আমাকে বলেছে এটা করতে, এটা বলতে”। অর্থাৎ এই চিন্তাটা যে তার নিজেরই চিন্তা এটাই বাচ্চারা বুঝতে পারেনা। এবং এই “ও” কে অনেকসময়ই বাবা-মা রা ধরে নেন কোন জ্বীন-ভূতের আছর এবং সেইদিকে চিকিৎসা করান ফলশ্রুতিতে বাচ্চা ভাল না হয়ে আরো দিনকে দিন খারাপ হতে থাকে।

আরেকটা বিষয় মনে রাখা জরুরি, একটু খুতখুতে কিন্তু আমরা সবাই। তাই বলে আমরা সবাই কি ওসিডি রোগী? অবশ্যই না। আপনার খুতখুতে স্বভাব যতক্ষন পর্যন্ত আপনার মানসিক যন্ত্রনার কারন না হবে, ততক্ষন পর্যন্ত আপনার কোন রোগ নেই৷

সালাম সাহেবের রোগ

ওসিডি নিয়েতো অনেক গল্প হল, এবারে ফিরে যাই সালাম সাহেবের গল্পে। সালাম সাহেবের কী হয়েছিল আসলে? তিনি কি সত্যিই ওসিডি আক্রান্ত?

এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া এই মূহুর্তে বেশ কঠিন। সালাম সাহেবের ওসিডি থাকতেও পারে, নাও পারে। আবার হতে পারে ওসিডি নয়, ওসিপিডি ( Obsessive Compulsive Personality Disorder) আছে। আবার এও হতে পারে ওনার এই স্বভাবটা কোন রোগের মধ্যে পড়েই না, উনি স্রেফ একজন খুঁতখুতে স্বভাবের মানুষ মাত্র।

সম্প্রতি অল্প কিছু গবেষনায় পাওয়া গেছে যে কোভিড-১৯ অনেকের ওসিডি রিস্ক বাড়ায়, এদের মধ্যে যাদের আগে থেকেই ওসিডি আছে তাদের ক্ষেত্রে অসুখটির তীব্রতা বেড়ে যাবার সম্ভাবনা দেখা গেছে৷

তবে সঠিক ডায়াগনোসিসটা জানার জন্য সালাম সাহেবকে যেতে হবে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে, কারন বুকে ব্যথার কারন যেমন বুকে স্টেথো না ধরে, ইসিজি না করে বোঝা যায়না, মানসিক সমস্যার কারনও ঘরে বসে কিংবা ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে জানা যায়না। এরজন্য বিশেষজ্ঞের শরনাপন্ন আপনাকে হতেই হবে।

মনে রাখবেন,আপনাকে আপনার চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে না, আপনার চিন্তারা যেন আপনাকে নিয়ন্ত্রণ না করে কেবলমাত্র সেটা নিশ্চিত করতে পারলেই চলবে। 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top