নতুন উপসর্গে পরিচিত রোগ – করোনায় র‍্যাশ কেন হয়?

covid 19 patient experience

এই সিরিজের আগের লেখা পড়ুন এখানে

৫ তারিখ সকালে ছিল আমার বাড়ি ফেরার দিন, অর্থাৎ আমার হোম আইসোলেশন শুরু করার দিন। ফেরার আগে আমি কিছু প্রস্তুতি নিয়েছিলাম।প্রথমত, ফোন করে বাসায় জানালাম আমার জন্য বেশ অনেকগুলো ওয়ানটাইম প্লেট, গ্লাস আর একটা প্যাডেল বিন কিনতে। কারন আমার টার্গেট ছিল আমার রুমে যেসব জিনিস ঢোকার প্রয়োজন সেগুলো ঢুকবে, কিন্তু রুম থেকে কিছু বের হবেনা৷

দ্বিতীয়ত, খাবারদাবার ওয়ান টাইম প্লেটে করে রুমের সামনে রেখে যাবে, আমি সেগুলো ভিতরে নিয়ে খাওয়াদাওয়া শেষে প্লেট-গ্লাস বিনে ফেলে দিব। বাথরুমের জন্যও আমার বের হয়াওয়ার প্রয়োজন নেই কারন আমার রুমের সাথেই এটাচড বাথরুম আছে। এটা ছিল আমার প্রপার আইসোলেশন মেইন্টেনেন্সের জন্য একটা প্লাস পয়েন্ট।

নিজ গৃহে পরবাসী

ডরমিটরি থেকে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হই সকাল ১০.৩০ এ। কোভিড সনাক্ত হওয়ার পড়ার পর ফার্স্ট লাইন ইনভেস্টিগেশন্স হিসাবে কিছু টেস্ট করাতে হয়, সেদিন আসার পথে আমি সেগুলো করিয়ে আসি। অত:পর বাসায় আসি দুপুর ১২ টার দিকে। নিজের রুমে ঢোকার পর কেমন যেন লাগছিল। এ যেন এক পরীক্ষা থেকে ফিরে আসার পর আরেক পরীক্ষা দেয়ার অনুভুতি। এই পরীক্ষা যতটা না নিজের, তারচেয়েও নিজের থেকে নিজের আপনজনকে বাচানোর পরীক্ষা..

বহুদিন পর নিজের বিছানাটা দেখে খুব ভাল লাগল। ডর্মে থাকাকালীন প্রতিদিন রাতে ঘুমাতে যাবার সময় আমার বিছানাটাকে মিস করতাম। আরো একটা বিষয় ভাল লাগল যে, আমি যেভাবে বলে রেখেছিলাম তার থেকেও অনেক পরিপাটি করে গোছানো হয়েছে আমার রুম। আমি যা যা রাখতে বলেছিলাম সেগুলোর বাইরেও কিছু জিনিস ছিল- যেমন ওয়াটার হিটার, পানির ফিল্টার, খাবার খাওয়ার জন্য ছোট একটা ফোল্ডিং টেবিল। আরো ছিল অনেক রকমের শুকনো খাবার, যাতে মেইন মিলের মাঝখানে খিদে পেলে অন্য কিছু খেতে পারি।

গোসল, খাওয়াদাওয়া শেষে সেদিন দুপুরে একটা লম্বা ঘুম দিলাম।

গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলো

corana patient's chest x-ray bangladesh

সন্ধ্যায় আমার টেস্টের রিপোর্টগুলো পেলাম। ব্লাড রিপোর্টগুলো ভালই ছিল, সমস্যা দেখা দিল বুকের এক্সরেতে। দুই লাংসেই ইনভলভমেন্ট ছিল। এক্সরের ছবি তুলে হোয়াটসঅ্যাপে আমাদের মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক স্যারকে পাঠিয়ে দিলাম। স্যার জানতে চাইলেন আমার শ্বাসকষ্ট আছে কিনা, অক্সিজেন স্যাচুরেশন ঠিক আছে কিনা৷ আল্লাহর রহমতে আমার এই সমস্যাগুলো ছিলনা, সেজন্য স্যার বললেন যেহেতু এই সিম্পটমগুলো নেই প্লাস আমার বয়স কম, অন্য কোন অসুখ যেমন ডায়াবেটিস, প্রেশার ইত্যাদি নেই কাজেই আমার চিন্তার কিছু নেই। লাংসের এই সমস্যা ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে।

তবে স্যার খুব জোর দিয়ে যেটা বললেন সেটা হল সামনের ৮-১২ তম দিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই দিনগুলোতে “cytokine storm” হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেক্ষেত্রে নতুন কোন লক্ষন আসে কিনা বা পুরোনো কোন লক্ষনের অবনতি ঘটে কিনা, শ্বাসকষ্ট হয় কিনা এগুলো খেয়াল রাখতে বললেন। মূলত করোনা আক্রান্ত হওয়ার ৭ দিন পর অনেকেই একটু ভাল বোধ করতে থাকেন, মাইল্ড করোনায় তো অনেকেই ভাবেন বোধহয় একেবারেই সুস্থ হয়ে গেছেন। সেক্ষেত্রে পূর্ব প্রস্তুতি না থাকলে ৮-১২ তম দিনে হঠাৎ করে যখন রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটে, তখন উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে নিতেই রোগীর ভয়ানক বিপদ হয়ে যেতে পারে।

এভাবেই শুরু হল আমার নব-নির্বাসিত জীবনযাপন। সেদিন ছিল আমার অসুখের ৬ষ্ঠ দিন আর আজ যখন এই লেখাটা লিখছি তখন আমার অসুখের ১৪ তম দিন। আর কয়দিন বাদেই আবার কোভিড টেস্ট করাব।

কোয়ারেন্টাইন অভিজ্ঞতা

আমার এই পুরো কোয়ারেন্টাইন সময়জুড়ে আমি যেটা সবচেয়ে বেশি অনুভব করেছি তা হল, কোয়ারেন্টাইনে শারীরিক সুস্থতার চেয়েও মানসিক সুস্থতা অনেক অনেক বেশি জরুরী। করোনা একটি ভাইরাল অসুখ। অন্যান্য ভাইরাল অসুখের মত এই অসুখেও কিছুদিন ভুগে বেশিরভাগ মানুষই সম্পূর্ন সুস্থ হয়ে যায়, শুধুমাত্র বয়জ্যেষ্ঠ বা অন্যান্য কো-মরবিডিটিজ আছে এরকম মানুষের ক্ষেত্রে আমাদের চিন্তা করতে হয়। কিন্তু যেটা হয় যে, কেউ যখন প্রথমে শোনে সে করোনা পজেটিভ, তখনই সে মানসিকভাবে ভীষনরকমের ভেংগে পড়ে। এতে করে তার শারিরীক কষ্ট আরো বেড়ে যায়।

এজন্য এসময় প্রয়োজন, কাছের মানুষদের সাপোর্ট এবং পরিচিত পরিবেশে থাকতে পারা। আমি নিজের ক্ষেত্রেই দেখেছি, যে কয়দিন আমি ডরমিটরীতে ছিলাম, অসুস্থ তো ছিলাম বটেই কিন্তু মানসিকভাবেও খুব অসহায় লাগত। কিন্তু যেই মূহুর্তে আমি নিজের রুমে প্রবেশ করলাম, মনের ভিতর থেকে আপনাআপনিই একটা পজেটিভ তাড়না আসছিল, এবার বোধহয় আমি খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাব! এবং সত্যিই সেদিন দুপুরে খেয়েদেয়ে আমি যে একটা ঘুম দিয়েছিলাম, এরকম ঘুম আমি বিগত দুই সপ্তাহে একদিনও ঘুমাইনি!

আবার লিভার এনজাইম বেশি থাকার কারনে কিছু খেতেও পারতাম না, খাবার মুখে নিলেই বমি আসত। এর মাঝে ডরমিটরির খাবারগুলো ছিল গোদের উপর বিষফোঁড়া মত। চিবাতে চিবাতেই জান কাবার! কিন্তু বাসায় আসার পর এই সমস্যারও সমাধান হল। আমার মা অল্প তেল, মশলা দিয়ে পাতলা জাউ রান্না করে দিতেন যেটা আমি খেতে পারতাম।

আরেকটা বিষয় বলছিলাম- কাছের মানুষদের সাপোর্টের কথা। চিন্তা করে দেখুন, মানুষ যখন অসুস্থ হয় তখন কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই সে চায় তার ভাতটা কেউ মেখে দিক, মুখে তুলে খাইয়ে দিক কিংবা মাথায় একটু পানি ঢেলে দিক। করোনায় যেগুলোর কোনটাই সম্ভব নয়। এ অসুখ এমন এক অসুখ, যেই অসুখে ‘বাচলেও নিজে বাচি, মরলেও নিজে মরি’ টাইপ অবস্থা!

কিন্তু ফিজিক্যালি সম্ভব না হলেও ভার্চুয়ালি ফোন, মেসেঞ্জার, ভিডিওকলের মাধ্যমে আমরা কিন্তু করোনা আক্রান্ত মানুষটার পাশে থাকতে পারি। কিছুই না, যাস্ট তার সাথে একটু কথা বলা, একটু গল্প করা, যতটুকু সময় অসুস্থ ব্যক্তি দিতে পারে আরকি। এতটুকু কথা বলাতেই ওই মানুষটার মানসিক জোর অনেকখানি বেড়ে যায়। তবে তার উপযুক্ত বিশ্রামের ব্যাপারটাও আমাদের মাথায় রাখতে হবে৷ কথা বলতে গিয়ে যদি অসুস্থ ব্যক্তিকে রেস্ট নেয়ার সময় দেয়া না হয় তাহলে কিন্তু বিপদ।

সেই সাথে নিজেও নিজেকে মেন্টালি বুস্ট আপ করা প্রয়োজন। দেখা যায় হয়ত করোনার ফিজিক্যাল সিম্পটম গুলো উন্নতি হওয়ার পরেও একটা লম্বা সময় আইসোলেশনে থাকতে হচ্ছে৷ সেই সময়গুলো একেবারেই কাটতে চায়না, ভীষন মনখারাপ লাগতে থাকে। এই সময়টাতে তাই নিজের পছন্দমত এবং শরীরের অবস্থা অনুযায়ী যেকোন কাজে মন দিতে পারেন। আমি যেমন ব্লগিং বেছে নিয়েছি। পড়াশুনার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু মনযোগ দিতে পারিনা, বেশিক্ষন বসে থাকতেও পারিনা, নতুন উপসর্গ হিসাবে যুক্ত হয়েছে কোমড়ে ব্যথা৷ সে হিসাবে শুয়ে, বসে মোবাইলের নোটপ্যাডে লেখালেখি করাটা আমার কাছে সুবিধাজনক মনে হয়েছে।

নতুন উপসর্গের আগমন

যেই না একটু সুস্থবোধ করা শুরু করলাম সেই গত তিনদিন ধরে আমার একটা নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে- পুরো শরীরভর্তি গুটি গুটি র‍্যাশ। এটাকে মেডিকেলের ভাষায় বলে, “viral exanthem”। যদিও কোভিডে ভাইরাল এক্সান্থেম হওয়ার ঘটনা খুবই রেয়ার।

rash in patient's body during covid 19

পুরো শরীরভর্তি ছোট ছোট ভেসিকুলার র‍্যাশ (চিকেনপক্সের পানির দানার মত) যেগুলোতে প্রচন্ড চুলকানি হয়। চুলকানির জন্য রাতে ঘুমাতে পারিনা এমন অবস্থা।

মেডিসিনের স্যারকে বলার পর স্যার রেফার করলেন ডার্মাটোলজির এক স্যারের কাছে৷ স্যার হোয়াটসঅ্যাপে আমার এগুলো দেখে বললেন, “তোমার এগুলো Cutaneous manifestation of COVID-19। লিটারেচারে এসেছে মাত্র ৮% কোভিড আক্রান্তদের মাঝে এমনটা পাওয়া গেছে৷ ইনফ্যাক্ট আমি নিজেও এর আগে দেখিনি।আজকে তোমারটা দেখলাম। তুমি কিছু ছবি তুলে রেখো তো!”

মনে মনে ভাবলাম, স্যার আপনি না বললেও আমি ছবি তুলে রাখব, কারন কয়দিন পর হয়ত আমার নিজেরই বিশ্বাস হতে চাইবেনা আমার কখনো এমনটা হয়েছিল! আমরা আসলে কষ্টের সময়গুলো খুব তাড়াতাড়ি ভুলে যাই। স্রষ্টা আমাদের এভাবেই তৈরি করেছেন৷ অবশ্য এরকম না হলে বেচে থাকাটা খুব কঠিন হত আমাদের জন্য…

ডার্মাটলজিস্ট স্যারের পরামর্শে নানান রকম ওষুধ ইতিমধ্যেই শুরু করে দিয়েছি। তারপরও সত্যি বলতে এই র‍্যাশের কারনে ভয়ানক কষ্ট পাচ্ছি। মনকে ডাইভার্ট করতে তাই রাতদিন নিজের অভিজ্ঞতা লিখে যাচ্ছি।

শেষ উপাখ্যান

শেষ করি একটি ছোট্ট ঘটনা দিয়ে। ঘটনাটা ছোট, কিন্তু কথায় বলেনা, কিছু কিছু ঘটনা থাকে যেগুলোর ব্যপ্তি খুব কম সময়ের জন্য হলেও সারাজীবনের জন্য মনে দাগ কেটে যায়? সেরকমই একটা ঘটনা।

ঘটনাটা একসপ্তাহ আগের। সেদিন দুপুরে খেয়েদেয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিলাম। হঠাৎ ফোন এল। ফোন ধরতেই একজন নারীকন্ঠ জানালেন তিনি আইইডিসিআর থেকে ফোন দিয়েছেন৷ আমিও পরিচয় দিলাম যে আমি ডাক্তার৷ এমনিতেই উনি খুব চমৎকার ভাবে কথা বলছিলেন, ডাক্তার পরিচয় দেয়ার পর আরো চমৎকারভাবে কথা বলতে লাগলেন। আমার অসুখের বৃত্তান্ত নিলেন, পরিবারের বৃত্তান্ত নিলেন৷ সব কোভিড পেশেন্টেরই নাকি এইসব ইনফরমেশন নেন উনারা।

প্রায় ২০ মিনিট কথা বলা শেষে এবার ফোন রাখার পালা। কিন্তু ফোন রাখার পূর্বে উনি যেটা করলেন সেটার জন্য আমি একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না৷

ফোন রাখার পূর্বে তিনি বলছিলেন, “ম্যাডাম আপনার সুস্থতা কামনা করি। আপনারা আমাদের ফ্রন্টলাইন ফাইটার। আপনাদের কিছু হলে খুব কষ্ট লাগে ম্যাডাম..” এই কথা বলতে বলতেই উনার গলা ধরে আসল এবং উনি রীতিমতো কান্না শুরু করে দিলেন। কান্নাজড়িত কন্ঠে বারবার বলতে লাগলেন “ম্যাডাম সত্যি খুব খারাপ লাগে যখন দেখি ডাক্তাররা করোনায় আক্রান্ত হন, অনেকে মারাও যান। খুব কষ্ট হয় ম্যাডাম.. আমাদের জন্যই তো আপনারা আক্রান্ত হন.. আমাদের সেবা দিতে গিয়েই তো..”

আমি পুরো সময়টা কিছুই বুঝতে পারছিলাম না আমার কী করা উচিত, কী প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত বা কী বলা উচিত। শুধু চুপচাপ শুনে যাচ্ছিলাম। শেষে ফোন রাখার আগে আবার সরি বলে বললেন, “ম্যাডাম কিছু মনে করবেন না, আমি একটু বেশি ইমোশনাল..”

অন্য সময় হলে আমি হয়ত হেসে ফেলতাম কিন্তু এখন আমি যেই সিচুয়েশনে আছি, এই সিচুয়েশনে চেনা নাই জানা নাই, সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন মানুষ যখন আমার জন্য সত্যিকারভাবেই মন থেকে ফিল করে, তখন আমি নিজেও একটু ইমোশনাল হয়ে যাই।

কোভিড নিয়ে দুইদিন আগেও হাজারো হতাশা ঘুরপাক খেত মনে- কেন আমি ছয়টা মাস নিজেকে সুরক্ষিত রাখার পরও আজ কোভিড রোগীর সেবা করতে গিয়ে আক্রান্ত হলাম, আক্রান্ত হওয়ার বিনিময়ে কিইবা পেলাম? প্রনোদনার কথা বাদই দিলাম, মুখের কথা দিয়েও কি আমাদেরকে একটা সম্মাননা দেয়া যেতনা? আমরা কি এতটুকু পাওয়ারও যোগ্যতা রাখি না? পরিবার, বাবা মা, সন্তানের কথা না ভেবে, যে ঝুঁকি, যে কষ্টের কাজকে আমরা হাসিমুখে বরন করে নিচ্ছি, তার প্রতিদানে কি এইটুকু চাওয়া খুব বেশি কিছু? এগুলো ভেবে খুব হতাশ লাগত মাঝে মাঝে। নিজের প্রফেশনের উপর, এই প্রফেশনকে বেছে নেয়ার ডিসিশানের উপর রাগ লাগত।

কিন্তু সেদিনের সেই ফোনকলের পর আজ পর্যন্ত কখনো মনখারাপ হলে আমি সেই অপরিচিত মহিলার কথাগুলো মনে করি আর মনে মনে ভাবি, ছোট্ট এই চিকিৎসক জীবনে অপ্রাপ্তির খাতা খুললে হয়ত হিসাব শেষ হবেনা কিন্তু এর মাঝেও ছোট ছোট এই ভালোবাসাগুলোই আমার অর্জন, আমার সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরনা।

জীবনকে যতই মন্দ বলে গালাগাল করি, জীবন আমাকে বারবার দেখিয়ে দেয়, সে আসলে এতটাও মন্দ না!

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top