ধেয়ে আসা অসুখ – ক্লান্ত হয়ে বসে রই করোনার প্রতীক্ষায়!

corona symptoms

এই সিরিজের আগের লেখা পড়ুন এখানে

আমার কোভিড ডিউটি শেষ হয় অক্টোবরের ৩০ তারিখ, শুক্রবার । পরদিন শনিবার বেলা ১১ টায় আমাদের চেকআউট টাইম। চেকআউটের পর আমাদের যাওয়ার কথা বিএসএমএমইউ ডরমিটরিতে, ডিউটি পরবর্তী সাতদিন আইসোলেশনে থাকার জন্য৷ শেষ ডিউটিটা করে এসেই তাই জিনিসপত্র গোছগাছে লেগে গেলাম। মনের মধ্যে একটা স্বস্তি কাজ করছিল, অবশেষে আমার কোভিড ডিউটি শেষ হল!

শেষ হইয়াও হইল না শেষ

পরদিন সকালে আমার ঘুম ভাংগল একটা অস্বস্তি নিয়ে। অস্বস্তিটা কীজন্য সেটা প্রথমে বুঝতে পারছিলাম না। বুঝতে পারলাম বিছানা থেকে নামার সময়। টের পেলাম আমার সমস্ত শরীরে প্রচন্ড ব্যাথা, যেন কেউ আমাকে আচ্ছামত মেরেছে। ভাবলাম, গত সাতদিন যে না খেয়ে, না ঘুমিয়ে ডিউটি করেছি, তারই একটা ইফেক্ট হয়ত। প্রচন্ড খারাপ লাগা স্বত্ত্বেও ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করলাম, গোছানো জিনিসপত্র আবার রিচেক করলাম, তারপর ঠিক ১০.৪০ এ আমাদের নিতে গাড়ি আসল। জিনিসপত্র নিয়ে গাড়িতে উঠে রওনা হলাম ডরমিটরির উদ্দেশ্যে।

হোস্টেল জীবনের পুনরাবৃত্তি

ডরমিটরিতে পৌছে বেশ ভাল লাগল। অনেক বড় জায়গা জুড়ে বানানো ডরমিটরি, আলো বাতাসে পরিপূর্ণ৷ মেয়েদের থাকার জায়গা হল তিনতলায়। আমার রুমে ঢুকে দেখলাম বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রুম, দুপাশে দুটা সিংগেল খাট, যদিও প্রতি রুমে একজন করেই থেকেছি। সবকিছুই ভাল শুধু একটাই সমস্যা চোখে পড়ল সেটা হল বাথরুম বেশ দূরে। ডরমিটরির জন্য এটা অবশ্য খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। যাই হোক, রুমে ঢুকে সব সেট করে নিতে নিতেই লাঞ্চের টাইম হয়ে গেল। সবার সাথে নিচে ডাইনিং এ গেলাম লাঞ্চ করতে।

ইতিমধ্যে আমার শরীর আরো খারাপ হওয়া শুরু করেছে। সর্দি সর্দি ভাব, নাক বন্ধ। খেতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম ভীষন ক্ষুধা থাকা সত্ত্বেও কিছুই খেতে পারছিনা। বাধ্য হয়ে অর্ধেক খেয়ে উঠে গেলাম। সেদিন বাকি সময়টাও কাটল একইভাবে, রাতেও ঠিকমত খেতে পারলাম না। পরদিন আমার অবস্থার আরো অবনতি হল। রুম থেকে বের হয়ে যে বাথরুম পর্যন্ত হেটে যাব, তাতেও ভীষন কষ্ট হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল আমার সমস্ত শরীর ভেংগেচুরে আসছে। এত ক্লান্তি শরীর জুড়ে.. যেন কতমাস ঘুমাইনি আমি! এর মাঝে বাসা থেকে মা ফোন দেয়। আমার গলা বসা, নাক বন্ধ এসব সিম্পটম টের পেয়ে আমার মা টেনশনে পড়ে যায়। আমি তাকে অভয় দেই “সাধারন ঠান্ডা” বলে।

অন্যরকম জ্বর

আমার সিম্পটমগুলো নিয়ে প্রথম খারাপ এক্সপেরিয়েন্সটা হয়েছিল সেদিন রাতে ঘুমানোর পর। ভোর ৫ টার দিকে প্রচন্ড মাথাব্যাথায় আমার ঘুম ভেংগে যায়। ঘুম ভেংগে শুনি ফজরের আজান দিচ্ছে। তীব্র যন্ত্রনায় আমি ঠিকমত চোখ মেলতে পারছিলাম না। সেই সাথে অনুভব করলাম জ্বর জ্বর লাগছে, মুখের ভিতরে কেমন একটা অস্বাভাবিক স্বাদ। সাথে থার্মোমিটার না থাকায় টেম্পারেচার মাপার কোন সুযোগ ছিল না।

শুয়ে শুয়েই ভাবতে লাগলাম, আমার এখন একটা প্যারাসিটামল খাওয়া উচিত। কারন জ্বর আসুক না আসুক, মাথাব্যাথার যে অবস্থা দেখছি, এটা এখনই না কমালে একটুপর হয়ত ওষুধ খেয়েও কমবে না। কোনরকমে বিছানা থেকে নেমে টেবিলের উপর থেকে একটা প্যারাসিটামল খেয়ে আবার বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম। কতক্ষন এভাবে শুয়ে ছিলাম মনে নেই। একসময় টের পেলাম আমি ঘেমে যাচ্ছি, সেই সাথে মাথাব্যাথাটাও যেন ছেড়ে যাচ্ছে। বুঝলাম, আমার আসলেই তখন জ্বর এসেছিল।

বন্দী জীবনের সূত্রপাত

এই ঘটনার পরেরদিন অর্থাৎ সোমবার থেকে আমি ঠিক করলাম আমি আর নিচে খেতে যাবনা, খাবার রুমে দিয়ে যেতে বলব। শুধু খাওয়া না, পারতপক্ষে বাথরুমে যাওয়া ছাড়া আর রুম থেকে বের হবনা। আমার কলিগরাও ঠিকমত আইসোলেশন মেইনটেইন করা শুরু করলেন। কারন অলরেডি ততদিনে আমাদের গ্রুপের একজনের করোনা পজেটিভ চলে এসেছে, তার ওপর আমার এইসব লক্ষন।

যদিও আমি তখনো মন থেকে বিশ্বাস করতে চাইতাম না যে আমার করোনা হয়েছে, বা হতে পারে। আমার প্রতিবছরই একটা সিজনে ফ্লু হয়। আমি মনে প্রানে বিশ্বাস করতে চাইতাম, হয়ত এগুলো আমার সেই ফ্লু’র লক্ষন, অলরেডি যেহেতু সিজন চেঞ্জ হচ্ছে। কিন্তু তারপরও, অন্য সবার জন্য হলেও আমার আইসোলেশন মেইনটেইন করা উচিত এটা বুঝতে পারছিলাম।

শুরু হল আমার কষ্টের দিন। সারাটাদিন নিজ রুমে একা একা থাকা। বেশিরভাগ সময় কাটে শুয়ে। শোয়া অবস্থায় এপাশ থেকে ওপাশ ফিরতেও প্রচন্ড কষ্ট হত৷ সময় কাটাতে আমার সংগী হল নেটফ্লিক্স। কিন্তু তাতেও বেশিক্ষন মনোযোগ দিতে পারতাম না। আমার অন্য কলিগদের সাথে কথা হত ফেসবুক, মেসেঞ্জারে। এমনিতে আমি মানসিকভাবে ভীষন শক্ত একজন মানুষ। তারপরও জীবনে এই প্রথম কেন জানিনা প্রচন্ড মনখারাপ হতে লাগল। সবাই খেতে নামে নিচে, আমি নামি না।

সবাই আমার সাথে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলে চলে যায়। এটাতে তাদেরও কোন দোষ নেই। সবাই সবার জায়গা থেকে সেইফটি এনশিওর করবে, এটাই তো নিয়ম। কিন্ত তারপরও আমার নিজেকে প্রচন্ড একা লাগতে থাকে, কষ্ট হতে থাকে। এই প্রথম আমি অনুভব করতে পারলাম, একজন করোনা পেশেন্টের কেমন লাগে যখন কিনা সবাই তার দরজার সামনে এসে উকি দিয়ে চলে যায়।

অবস্থার ক্রমাগত অবনতি

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাদের সবার কোভিড টেস্ট করার কথা বুধবার, ৪ তারিখ৷ আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম বুধবারের। এর মাঝে প্রতিদিন আমার অবস্থার অবনতি হতে থাকল। সারাদিন শুয়ে থাকি, বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ানোর মত এক ফোটা শক্তি নেই। কোন খাবার মুখে নিতে পারিনা, পানিও না। মুখে কিছু দেয়ামাত্রই প্রচন্ড বমির বেগ হয়। ওদিকে আবার অল্প খাওয়ার দরুন একটু পরেই পেট খালি হয়ে যেত। তখন শুরু হত গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা৷ শুয়ে শুয়ে তখন রুমে রাখা খাবারদাবারের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। কিন্তু মুখে দেয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা হত না৷ মোটকথা, খাওয়া নিয়ে এরকম কষ্ট আমি জীবনে কখনো পাইনি।

অলুক্ষনে লক্ষন

সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ঘটনাটা ঘটল মংগলবার রাতে। যথারীতি ডিনার করতে বসে বমি পাচ্ছিল। ভাবলাম ভাতের মধ্যে একটু লেবু কচলে নিয়ে খাই। লেবু কাটতে গিয়ে হঠাৎ লক্ষ্য করলাম আমি লেবুর কোন গন্ধ পাচ্ছিনা। গন্ধ নেয়ার জন্য একদম নাকের কাছে লেবুর একটা পিস ধরে দেখলাম.. নাহ একদমই কোন গন্ধ পাচ্ছিনা। এরপর আমার হাতের কাছে যত ক্রিম, লোশন, শ্যাম্পু ছিল সবকিছুর ঢাকনা খুলে একে একে গন্ধ নিতে থাকলাম। কোন কিছুরই কোন গন্ধ পেলাম না। সেদিন সেই মূহুর্তে আমি প্রথমবারের মত একটা আতংক অনুভব করলাম। বারবার মনে হতে লাগল, খুব ভাল কিছু নেই সামনে। যেই কথাটা এতদিন ভাবতে চাইনি, মনে আসলেও মন থেকে সরিয়ে দিয়েছি, হয়ত সেটিই আজকে থেকে আমার ভাবা উচিত৷

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আবেগী না হয়ে কিছু লজিক্যাল কাজ করে ফেলা উচিত বলে মনে হল। প্রথমেই আমি বাসায় ফোন দিলাম। মাকে এতদিন ধরে বলে এসেছি, আমার সিজনাল সর্দি-কাশি। এখন যদি টেস্টে আমার কোভিড পজেটিভ আসে আর সেটা হুট করে তাকে জানানো হয়, বেচারী একেবারেই ভেংগে পড়বেন। তাই এখনই তাকে একটু হিন্ট দিয়ে রাখা উচিত। সেই সাথে পরবর্তী পদক্ষেপ স্বরূপ বাসায় আমার নিজ রুমে আইসোলেশনের ব্যবস্থা করতে হবে, সেই বিষয়েও আলাপ করা প্রয়োজন। কারন টেস্ট পজেটিভ হোক বা নেগেটিভ, আর দুইদিন বাদে আমাকে ডর্মিটরী ছেড়ে বাসায় যেতেই হবে৷ সেক্ষেত্রে বাসায় যে দুজন বয়স্ক বাবা-মা আছেন, তাদেরকে আমি কোনভাবেই রিস্কে ফেলতে পারিনা।

অনাকাংখিত দিনের আগমন

অবশেষে এল বহু প্রতীক্ষিত স্যাম্পল কালেকশন ডে। সকাল দশটায় স্যাম্পল নেয়ার কথা। আমরা সবাই আগে আগেই হাজির হলাম রিসেপশন রুমে। একে একে ২৮ জন ডাক্তার আমরা প্লাস বাইরে থেকে আসা আরো কয়েকজন স্যাম্পল দিলাম। জানানো হল, সেদিন রাতের মধ্যেই মেসেজের মাধ্যমে রিপোর্ট চলে আসবে মোবাইলে। স্যাম্পল দিয়ে এবার তাই শুধু অপেক্ষার পালা৷

সারাদিনব্যাপী যত মেসেজ আসে ভয়ে ভয়ে মোবাইল চেক করি। এর মাঝে আমার শুরু হল পাতলা পায়খানা৷ কিছু খেলেই বাথরুমে দৌড়াতে হচ্ছে। এমনিতেই দূর্বলতার শেষ নেই, তার মধ্যে এতবার বাথরুম করার কারনে আরো দূর্বল হয়ে গেলাম। ওদিকে বমিভাবের কারনে পানি, স্যালাইন কিছুই ভাল লাগেনা।

রাত ১০টা পার হয়ে গেল, মেসেজ আর আসেনা। ধরে নিলাম হয়ত আজকে আর রিপোর্ট আসবেনা, আগামীকাল সকালে আসবে। শুয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, হঠাৎ রাত সাড়ে দশটার দিকে টুং করে মোবাইলের মেসেজ টোন বেজে উঠল। হাতে নিয়ে বুঝলাম, রিপোর্টের মেসেজ। পরম আরাধ্য সেই মেসেজখানা ওপেন করার আগে দুই সেকেন্ড একটু দম নিয়ে নিলাম। এরপর মেসেজটা ওপেন করলাম।

এবং ওপেন করার পর প্রথম যে শব্দটার দিকে আমার চোখ গেল তা হল, “POSITIVE”।

আবেগের আস্ফালন

যদিও এরকম একটা ঘটনার জন্য গতকাল রাত থেকে আমি নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করছিলাম, তারপরও কেন জানি “Positive” লেখাটা পড়ার সাথে সাথেই আমার চোখে পানি চলে আসল। অনেক এলোমেলো কথা একসাথে মাথায় ঘুরতে লাগল..

প্রথম প্রশ্ন- “আমিই কেন?” সেই শুরু থেকে ৬টা মাস আমি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেছি, নিজেকে এবং পরিবারকে করোনা থেকে সেফ রেখেছি। তাহলে কেন আজ করোনা আক্রান্ত কাউকে সেবা দিতে এসে আমি আক্রান্ত হলাম? প্রতিদিন রাস্তায় এত এত মানুষ মাস্ক ছাড়া ঘুরে বেড়াচ্ছে, চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছে, বিয়ে বাড়িতে যাচ্ছে, পার্টি করছে, তাদেরতো কিছু হয়না! গত দুইটা সপ্তাহ ধরে পরিবারের কারো মুখ দেখিনা। এখন আরো কতদিন এভাবে সবার থেকে আইসোলেটেড থাকব? দ্বিতীয় প্রশ্ন- বাসায় যে আইসোলেশনে থাকব যদি শতভাগ আইসোলেশন মেইনটেইন করতে না পারি? যদি আমার থেকে আমার পরিবারের কেউ আক্রান্ত হয়? তখন আমি কী করব? আর কেউ না জানুক ডাক্তার হিসাবে আমিতো জানি বয়স্ক মানুষদের করোনা হলে তার ফলাফল কী হতে পারে! প্রচন্ড রাগ, দুঃখ, হতাশা, অসহায়বোধ সবকিছু মিলিয়ে একটা মিশ্র অনুভূতি হতে লাগল।

এরপরের দুই মিনিট চুপচাপ কান্না করলাম। দুই মিনিট পর আস্তে আস্তে মাথা ঠান্ডা করে চিন্তা করলাম এখন আমার কী কী করনীয়৷ প্রথমেই নিজের বাসায় এবং বাসার বাইরে অন্যান্য যাদের জানানো প্রয়োজন, জানালাম। আমার কলিগ, ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র রেসিডেন্ট উনাদের জানালাম। এরপর শুরু করলাম আমার ফাইনাল গোছগাছ, ডর্ম থেকে বাসায় আইসোলেশনে যাওয়ার প্রস্তুতি..

এই সিরিজের সব লেখা পড়ুন এখানে

  • 160
    Shares
  • Shahira Sanjana says:

    এত সুন্দর করে কেউ কিভাবে লিখে আমি জানি না. পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম..

    • অসংখ্য ধন্যবাদ। এত সুন্দর কমেন্ট পেলে লেখার উৎসাহ আরো বেড়ে যায়। পরের পর্ব আসবে খুব শিগগিরই।

  • Shahira Sanjana says:

    এত সুন্দর করে কেউ কিভাবে লিখে আমি জানি না..পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম..

  • >
    Scroll to Top