ডিপ্রেশনঃ মনখারাপের চেয়েও বেশি কিছু

depression

আউটডোরে একবার একজন মহিলা রোগী পেয়েছিলাম, সত্তরোর্ধ্ব বয়স। রোগীকে নিয়ে এসেছিলেন তারই ছেলে, ছেলের বয়স চল্লিশের ঘরে। কী অসুবিধা জিজ্ঞেস করতেই ছেলে জানালেন, রোগীর মাথাব্যাথা। ব্যাথায় উনি ঘুমাতে পারেনা, কোন কাজ করতে পারেনা। এর আগেও চিকিৎসা নিয়েছিল, কিছুটা ভাল হয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে আবার ব্যাথাটা বেড়েছে।

আমি এবার রোগীর দিকে তাকালাম।

‘আপনি বলেন দেখি মা, কী কষ্ট আপনার..’

রোগী মাথা নিচু করে বসে ছিলেন। আমার প্রশ্ন শুনেও মুখ তুললেন না। মাথা নিচু করেই জবাব দিতে লাগলেন-

‘মাথার এই যে এদিকে ব্যথা, সারাক্ষন ব্যথা করে। কোনভাবেই শান্তি পাইনা।’

‘হুম। আর?’

‘আর মাথা জ্বলে, সারা শরীর জ্বলে।’

আমি রোগীর কাছে তার আগের চিকিৎসাপত্র চাইলাম। ছেলে জানাল চিকিৎসাপত্র হারিয়ে ফেলেছে কিন্তু ওষুধের নাম মনে আছে। একটি এন্টিডিপ্রেসেন্টের নাম বলল।

এবার আমি রোগীকে ডিপ্রেশনের লাইনে প্রশ্ন করা শুরু করলাম। দেখলাম ডিপ্রেশনের অনেক সিম্পটমই আছে। জিজ্ঞেস করলাম কতদিনের সমস্যা, পেশেন্টের ছেলে উত্তর দিল-

‘ম্যাডাম, আম্মার সমস্যাটা আসলে শুরু হয় ‘৯৭ সাল থেকে। ৯৭ সালে আমার বড়ভাই মারা যায়, তখন থেকেই আম্মার এরকম ঘুম হয়না, মনখারাপ, অস্থিরতা…’

ছেলে কথা শেষ কর‍তে পারল না। তার আগেই রোগী কান্না শুরু করলেন। কাদতে কাদতেই বললেন,

‘আমার ছেলেটা, আমার প্রথম সন্তান.. তেইশটা বছর পালসি যারে.. আমার সেই সন্তান, আমি বেচে থাকতে মরে গেল…..’

‘তেইশ বছর বয়সে মারা গেছে?!’

‘জ্বি..’ রোগী তখনো কাদছে।

‘কিভাবে??’

এই প্রশ্ন করতেই রোগীর কান্না যেন আরো বেড়ে গেল। পরে রোগীর ছেলের থেকেই জানলাম, তার বড়ভাই মানে রোগীর বড়ছেলেটি সুইসাইড করে মারা যায়। সুইসাইডের কারন তারা কেউ জানেন না, ছেলেটির কোন আচার আচরনে কখনো বুঝতেও পারেননি এমন কিছু ঘটতে পারে। ছেলের এই আকস্মিক মৃত্যু মা মেনে নিতে পারেননি। সেই থেকে আজ পর্যন্ত উনি ডিপ্রেশনের চিকিৎসা নিয়ে যাচ্ছেন।

ডিপ্রেশনের ভয়াবহতা

২০১৮ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট এর একটি জরিপ অনুসারে বাংলাদেশে বর্তমানে ডিপ্রেশনে আক্রান্ত রোগীর হার শতকরা ৬.৭ শতাংশ। একজন মানুষকে শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিকভাবে বিকলাংগ করে দিতে সক্ষম, বিশ্বব্যাপী এরকম সকল অসুখের তালিকার মধ্যে ডিপ্রেশনের স্থান চতুর্থ এবং শুধুমাত্র মানসিক রোগের তালিকার মধ্যে ডিপ্রেশনের অবস্থান প্রথম।

ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে, এই ডিপ্রেশন নিয়ে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে কথা যত বেশি, মানুষের ভুল ধারনা তার চেয়েও বেশি। একটু মন খারাপ হলেই আমরা তাকে ডিপ্রেশন নাম দিয়ে বসি৷ কিন্তু ডিপ্রেশন মানে কী শুধুই মন খারাপ? মন খারাপের সাথে আর কী কী বিষয় থাকলে কিংবা মন খারাপটাই ঠিক কতটুকু মাত্রায় থাকলে আমরা তাকে ডিপ্রেশন বলব? আসুন জানার চেষ্টা করি।

ডিপ্রেশন কী

যেকোন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আমাদের মন খারাপ করে দেয়। এটি খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু এই মন খারাপের মাত্রা কিংবা স্থায়িত্ব যখন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয়ে যায় তখন সেটিকে বলে ডিপ্রেশন।

ডিপ্রেশনের ধরন

ডিপ্রেশনের ধরন বা ক্লাসিফিকেশনের তালিকাটা বেশ লম্বা৷ সবগুলো নিয়ে লেখা সম্ভব না বিধায় আমি গুরুত্বপূর্ণ দুইটি ক্লাসিফিকেশন সম্পর্কে ধারনা দিচ্ছি।

ক্লিনিক্যালি যে ক্লাসিফিকেশনটা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় সেটি হল-

যে ডিপ্রেশনের পিছনে আপাতদৃষ্টিতে কোন কারন পাওয়া যায়না তাকে তাকে বলে Endogenous বা বায়োলজিকাল ডিপ্রেশন। আর যে ডিপ্রেশনের পেছনে কোন সুনির্দিষ্ট ঘটনা বা সমস্যা পাওয়া যায় সেটি হল Reactive depression.

ডিপ্রেশন বা বিষন্নতার এই প্রকারভেদটি সম্পর্কে সবার ধারনা থাকা গুরুত্বপূর্ন। কারন ডিপ্রেশন সম্পর্কিত প্রচলিত ভুল ধারনাগুলোর একটি হচ্ছে, ডিপ্রেশন হতে হলে তার পেছনে অবশ্যই কোন না কোন কারন থাকতে হবে। আপাতদৃষ্টিতে কোন সুনির্দিষ্ট কারন নেই, এমন কোন মানুষ যদি ডিপ্রেশনের কথা বলে, আমরা তার সমস্যাকে হেসেই উড়িয়ে দেই।
ফলাফল, এই মানুষগুলো সঠিক চিকিৎসার অভাবে দিনের পর দিন মানসিক কষ্ট নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসিফিকেশন হল- Unipolar & Bipolar depression. ইউনিপোলার ডিপ্রেশন হল যেই রোগে রোগীর সারা জীবনব্যাপী যতগুলো এপিসোড আসে সবগুলোই ডিপ্রেসিভ এপিসোড, অন্যদিকে বাইপোলার ডিপ্রেশন হচ্ছে বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডারের দুটি বিপরীতমূখী এপিসোড (ম্যানিক এবং ডিপ্রেসিভ এপিসোড) এর মধ্যে অন্যতম একটি এপিসোড। (বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার সম্পর্কিত একটি বিস্তারিত লেখা আমার ব্লগে আছে।)

ডিপ্রেশনের কারন

ডিপ্রেশনের কারন বলতে গেলে এককথায় বলা যায় সেরোটনিনের হ্রাস। কথায় বলে, “Serotonin is happiness.” যদিও সেরোটনিন ছাড়া আরো অনেক নিউরোট্রান্সমিটারের (যেমন ডোপামিন, নরইপিনেফ্রিন, গাবা ইত্যাদি) তারতম্য ঘটে থাকে তবুও সবচেয়ে বেশি প্রভাব হচ্ছে সেরোটনিনের৷

এখন প্রশ্ন হচ্ছে সেরোটনিন কেন কমে? এর উত্তর বেশ লম্বা৷

প্রথমত, কারো যদি বংশে ডিপ্রেশনের হিস্ট্রি থাকে (ফার্স্ট ডিগ্রী রিলেটিভদের মাঝে) তাদের এই রোগটি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ২০-৩০%৷ অন্যদিকে কারো কারো ব্যক্তিত্বের ধরন থাকে এমন যেটি ডিপ্রেশনের প্রভাবক। আবার আপাতদৃষ্টিতে কোন কারন ছাড়াই সেরোটনিন কমতে পারে (এটি সম্পর্কে আমি ইতিমধ্যেই বলেছি- বায়োলজিকাল ডিপ্রেশন)।

দ্বিতীয়ত, প্রতিকূল পরিবেশ বা ঘটনা ডিপ্রেশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক। বিশেষত, জীবনের প্রথমার্ধে ঘটে যাওয়া কোন অনাকাংখিত ঘটনা, যেটিকে আমরা বলি “Adverse early life experiences”, পরবর্তী জীবনে ডিপ্রেশন হওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

এজন্য দেখা যায় যেসব বাচ্চা ছোটবেলার কোন ঘটনায় বড় ধরনের মানসিক আঘাত পেয়ে থাকে (যেমনঃ বাবা-মায়ের ডিভোর্স, বাবা/মা মারা যাওয়া, শারীরিক/যৌন নির্যাতনের স্বীকার হওয়া ইত্যাদি) তাদের মধ্যে বেশিরভাগেরই পরবর্তীতে ব্যক্তিত্বের সমস্যা দেখা দেয় এবং একপর্যায়ে দেখা দেয় বিষন্নতা।

লিংগভেদেও ডিপ্রেশনের তারতম্য দেখা যায়। সাধারনত ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের ডিপ্রেশন হওয়ার হার দ্বিগুন৷ এর কারন হিসেবে অনেকগুলো হাইপোথিসিস আছে৷ এক, মেয়েরা স্বভাবগতভাবেই তাদের কষ্টের অনুভুতিগুলো মনের মধ্যে চেপে রাখে যেটা পরবর্তীতে প্রকাশ পায় ডিপ্রেশন আকারে। দুই, বিভিন্ন সমাজে প্রথাগতভাবেই ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার বেশি হয় মেয়েরা। তিন, মেয়েদের হরমোনাল তারতম্য।

এসবের বাইরে ছেলেদের ক্ষেত্রে ডিপ্রেশন হওয়ার হার কম হওয়ার দুটি ইন্টারেস্টিং থিওরী আছে। একটি হল, ছেলেরা সহজে ডিপ্রেশনের কথা স্বীকার করতে চায়না। এর কারন সম্ভবত সমাজের সেই চিরায়ত রীতি- ‘ছেলেদের কখনো কষ্ট পেতে নেই। ‘কষ্ট পাওয়া, কান্নাকাটি করা সেসব তো মেয়েদের কাজ!’

আরেকটি হল, ভুল ডায়াগনোসিস৷ বেশিরভাগ ছেলেই ডিপ্রেশন ভুলতে গিয়ে নেশার জগতে ডুব দেয়। ডাক্তারের কাছে যখন আসে তখন সে একজন পুরোদস্তুর মাদকাসক্ত। ফলাফল, এসব রোগীরা ডিপ্রেসড হিসেবে ডায়াগনোসড না হয়ে ডায়াগনোসড হয় “সাবস্টেন্স এবিউজার” হিসেবে।

এছাড়া কিছু শারীরিক অসুখ বিশেষ করে হরমোনাল সমস্যা (যেমনঃ Hypothyroidism, DM), কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ (যেমনঃ Steroid) ইত্যাদির কারনেও ডিপ্রেশন হতে পারে। এজন্য কোন রোগী ডিপ্রেশন নিয়ে আসলে এর পেছনের মানসিক কারনের পাশাপাশি শারীরিক কারনগুলোও মাথায় রাখা প্রয়োজন।

ডিপ্রেশনের লক্ষনসমূহ

DSM-5 অনুযায়ী ডিপ্রেসিভ ডিজঅর্ডারগুলোর একটি লম্বা ক্লাসিফিকেশন আছে, তবে তাদের মধ্যে সবচেয়ে কমন ডিজঅর্ডারটি হল ‘Major Depressive Disorder’ বা সংক্ষেপে MDD। এই MDD এর কিছু সুনির্দিষ্ট লক্ষন আছে। লক্ষনগুলো নিম্নরূপ –

১. Depressed mood, অর্থাৎ দিনের বেশিরভাগ সময় মন খারাপ থাকা এবং এই মনখারাপ ঘরে বাইরে সবজায়গায়, সকল পরিস্থিতিতেই বিদ্যমান।

২. Diminished Interest/pleasure, অর্থাৎ কোন কাজেই আগ্রহ/আনন্দ না পাওয়া।

৩. খাওয়ার রুচি কমে যাওয়া/ বেড়ে যাওয়া কিংবা স্বাভাবিক খাওয়াদাওয়া স্বত্ত্বেও ওজনের তারতম্য হওয়া।

৪. ঘুমের ব্যাঘাত ঘটা অথবা অতিরিক্ত ঘুমানো।

৫. অতিরিক্ত উত্তেজনা অথবা একেবারে ঝিম ধরে থাকা।

৬. শারীরিকভাবে দূর্বল লাগা।

৭. নিজেকে ভীষনরকমের অযোগ্য মনে হওয়া অথবা অযাচিত অপরাধবোধে ভোগা।

৮. কাজেকর্মে মনোযোগ দিতে না পারা অথবা সিদ্ধান্তহীনতা।

অনেকসময় এই মনোযোগহীনতার ব্যাপারটা পেশেন্ট এভাবে নিয়ে আসে যে, ” ইদানীং সবকিছু ভুলে যাচ্ছি”। আসলে প্রধান সমস্যা এখানে ভুলে যাওয়া না, কাজ করার সময় যথাযথ মনোযোগ দিতে না পারার কারনে পরবর্তীতে সেই বিষয়টা ব্যক্তি আর মনে করতে পারেন না।

৯. জীবনকে অর্থহীন মনে হওয়া, মরে যেতে ইচ্ছা করা, অনেকক্ষেত্রে আত্মহত্যার পরিকল্পনা থাকা কিংবা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াও আত্মহত্যার ইচ্ছা অথবা ইতোমধ্যে কোন সুইসাইড এটেম্পটের হিস্ট্রি থাকা।

উপরোক্ত লক্ষনগুলোর মধ্যে যদি অন্তত ৫টি বা তার বেশি লক্ষন (যাদের মধ্যে একটি অবশ্যই প্রথম দুটির একটি) যদি কোন ব্যক্তির মধ্যে অন্তত ২ সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে থাকে এবং এগুলো তার ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটায় তবেই তাকে আমরা Major Depressive Disorder বলব।

মনে রাখবেন “দৈনন্দিন কর্মকান্ডে ব্যাঘাত ঘটা” এই বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, অনেকেই আছেন যারা এই লক্ষনগুলো নিয়েও হয়ত নিজেদের দৈনন্দিন স্বাভাবিক কর্মকান্ড চালিয়ে যেতে পারছেন, তাদেরকে আমরা ডিপ্রেশনের আওতায় আনব না।

ডিপ্রেশনের ব্যতিক্রমী লক্ষনসমূহ

উপরে আলোচ্য লক্ষনগুলো ছাড়াও কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডিপ্রেশনের কিছু ব্যতিক্রমী লক্ষন দেখা যায়। বিশেষত, বাচ্চারা বেশিরভাগ সময়ই মন খারাপের চেয়ে ‘খিটখিটে মেজাজ’ নিয়ে আসে। সেক্ষেত্রে কোন বাবা-মা যদি এমন অভিযোগ করে যে তার হাসিখুশি সন্তান হঠাৎ করেই খুব খিটখিটে হয়ে গেছে, তখন অন্যান্য ডায়াগনোসিস এর সাথে সাথে ডিপ্রেশনের ব্যাপারটাও আমাদের মাথায় রাখতে হবে।

আরেকটি ব্যতিক্রমী লক্ষন হল, ‘মুড রিয়্যাক্টিভিটি’। সাধারনত ডিপ্রেসড মানুষদের কোন কিছুতেই মন ভাল হয়না, আনন্দের সংবাদ শুনলেও আনন্দ লাগেনা। তবে যাদের মুড রিয়্যাক্টিভিটি থাকে, তাদের ক্ষেত্রে মন খারাপ থাকলেও কোন আনন্দের সংবাদ শুনলে বা আনন্দের ঘটনা হলে তাদের মন কিছুসময়ের জন্য হলেও ভাল লাগে।

এর বাদে ডিপ্রেশনের রোগীরা প্রায়ই বিভিন্ন শারীরিক কম্পলেইন নিয়ে ডাক্তারের কাছে আসে। বিশেষ করে আমাদের দেশে; আরো সুনির্দিষ্ট ভাবে বললে গ্রামাঞ্চলে এবং পরিবারের মহিলা সদস্যদের, যেখানে মনের রোগের তেমন কোন গুরুত্বই নেই, সেখানে ‘আমার মনখারাপ’ এই কথাটা বলার চেয়ে ‘আমার মাথাব্যাথা, মাথার তালু জ্বলে’ বললে পরিবারের সদস্যদের কাছে ডাক্তার দেখানোর ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া যায়।

তবে এর মানে এই না যে রোগী এগুলো বানিয়ে বানিয়ে বলেন। সত্যিকার অর্থেই ডিপ্রেশনের রোগীদের সোমাটিক সিম্পটমস থাকে। কিন্তু সেই সাথে তাদের মনটাও খারাপ থাকে। একটু ভালমত হিস্ট্রি নিলেই যেটা বের হয়ে আসে।

ডিপ্রেশন এবং বিরেভমেন্ট

ডিপ্রেশনের কাছাকাছি কিছু বিষয় আছে যেগুলো অনেকসময় ডিপ্রেশন হিসেবে ভুল ডায়াগনোসিস হয়৷ তেমন একটি বিষয় হচ্ছে বিরেভমেন্ট (Bereavement)। বিরেভমেন্ট অর্থ খুব কাছের কোন মানুষের আকস্মিক মৃত্যু পরবর্তী শোক। প্রিয়মানুষের মৃত্যু কারোই কাম্য নয়। আর সেই মৃত্যু যদি হয় অনাকাঙ্ক্ষিত, তাহলে শোকের পাল্লা আরো ভারী হয়ে যায়।

এইধরনের শোকে অনেকসময় মানুষের কিছু মানসিক লক্ষন এবং আচরন দেখা দেয়, যেগুলো এরকম পরিস্থিতি বিবেচনায় খুব স্বাভাবিক। কিন্তু এ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকলে এটিকে ডিপ্রেশন বলে মনে হতে পারে।

এখন প্রশ্ন হতে পারে যে, বিরেভমেন্ট থেকে কী কখনো ডিপ্রেশন হতে পারে? এর উত্তর হচ্ছে “হ্যা।” বিরেভমেন্ট একটি স্বাভাবিক ঘটনা, কিন্তু সেটি একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত৷ এই নির্দিষ্ট সময়কাল হচ্ছে ছয় মাস। কিন্তু কারো যদি ছয় মাসের বেশি সময় ধরে বিরেভমেন্ট এর সিম্পটমগুলো থেকে যায়, তখন সেটিকে আমরা কম্পলেক্স বিরেভমেন্ট (complex bereavement) বলি আর কম্পলেক্স বিরেভমেন্ট একটা পর্যায়ে গিয়ে ডিপ্রেশনের আকার ধারন করতে পারে।

আমি শুরুতে যে রোগীর কথা লিখেছি, তার ক্ষেত্রে ঠিক এটিই হয়েছিল। ছেলের অস্বাভাবিক মৃত্যু ছিল তার জন্য বিরেভমেন্ট। এই বিরেভমেন্ট থাকতে থাকতে একসময় কম্পলেক্স বিরেভমেন্টের আকার ধারন করে এবং তারই দীর্ঘমেয়াদি পরিনাম আজকের এই ডিপ্রেশন।

ডিপ্রেশনের চিকিৎসা

ডিপ্রেশনের চিকিৎসা দেয়া হয়ে থাকে ডিপ্রেশনের মাত্রা এবং ধরন অনুযায়ী। সেই হিসেবে ওষুধ এবং সাইকোথেরাপি দুটোরই ভূমিকা আছে। যেমন মাইল্ড ডিপ্রেশনে ওষুধ দেয়ার প্রয়োজন হয়না, কিছু সাইকোথেরাপি যথেষ্ট। আবার মডারেট বা সিভিয়ার ডিপ্রেশনে ওষুধ এবং ক্ষেত্রবিশেষে সাইকোথেরাপিরও প্রয়োজন হয়।

যদিও অনেকের মনেই সন্দেহ থাকে যে, ওষুধ কিভাবে ডিপ্রেশন দূর করতে পারে?। অথচ ডিপ্রেশনের কার্যকারনের মধ্যে সেরোটনিনের যে ভূমিকা আছে সেটা সম্পর্কে ধারনা থাকলে এন্টিডিপ্রেসেন্ট নিয়ে কারো কোন সন্দেহ থাকার কথা না।

ডিপ্রেশনের ভবিষ্যৎ

ডিপ্রেশন বা মেজর ডিপ্রেসিভ ডিজঅর্ডার একটি এপিসোডিক রোগ। তাই এপিসোড আকারে রোগটি বারবার ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে। বলা হয়ে থাকে যে একবার এই অসুখ হলে পরবর্তীতে এই অসুখের ফিরে আসার সম্ভাবনা শতকরা আশি ভাগ। তবে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলে, বংশে এই রোগের ইতিহাস থেকে না থাকলে এবং নিয়মিত ওষুধ সেবন ও ডাক্তারের ফলোআপে থাকলে রোগটি নিয়ন্ত্রনে থাকে।

দুঃখের বিষয়, এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও অনেকেই ডিপ্রেশনকে ভান/ন্যাকামী বলে সম্বোধন করেন। অনেকে ডিপ্রেসড পেশেন্টকে উদ্দেশ্য করে এটাও বলেন, “তোমারতো সব আছে, তাও কিসের ডিপ্রেশন!” আশা করি আজকের পর থেকে তারা অন্তত এটা বুঝবেন, ডিপ্রেশন হওয়ার জন্য বস্তুগত জিনিসের অভাব থাকতে হয়না, এক সেরোটনিনের অভাবই যথেষ্ট! 

কাজেই, আপনার আশেপাশের ডিপ্রেসড মানুষটিকে অবহেলা না করে তার প্রতি সহানুভূতিশীল হন, সম্ভব হলে তাকে সঠিক চিকিৎসার আওতায় আনুন। জীবন তো একটাই। এই এক জীবনে একজন মানুষ আনন্দ নিয়ে বাচবে না, তা কি হয়? 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

10 thoughts on “ডিপ্রেশনঃ মনখারাপের চেয়েও বেশি কিছু”

  1. MD Hasan ul Kabir

    Very important & Narrative. Mass population will come to know about Depression
    very easily& will not be biased.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top