শিশুর দৈহিক বিকাশে মানসিক সুস্থতার ভূমিকা কতখানি?

baby 4661060 960 720

সাবিহা-আসিফ দম্পতির (কাল্পনিক) একমাত্র মেয়ে মাইশা। মাইশার বয়স বর্তমানে ২ বছর। বাবা-মা দুজনেই কর্মজীবি হওয়ায় মাইশার বেশিরভাগ সময় কাটে বাসার কাজের মেয়েটির কাছে। ইদানীং সাবিহা লক্ষ্য করছেন মাইশা যেন দিনদিন ভীষন শুকিয়ে যাচ্ছে। দুই বছর হিসেবে মাইশার গ্রোথ একেবারেই কম। কাজের মেয়েটিরও অভিযোগ মাইশা আজকাল কিছুই খেতে চায়না, উপরন্তু অহেতুক কান্নাকাটি করে। মিসেস সাবিহা ভাবলেন কাজের মেয়েটি হয়তোবা মাইশার সঠিক যত্ন নিচ্ছেনা। তিনি অফিস থেকে কয়েকদিনের ছুটি নিলেন মেয়েকে নিজের কাছে রেখে যত্ন করে খাওয়াবেন বলে। কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন মাইশা ওনার হাতেও কিছু খেতে চাচ্ছেনা। চিন্তিত হয়ে মেয়েকে নিয়ে ছুটে গেলেন ডাক্তারের কাছে।

ডাক্তার মাইশাকে দেখে প্রেসকিপশানে লিখলেন “Failure to thrive”, সেই সাথে কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে দিলেন। পরবর্তীতে মাইশার মা যখন সব রিপোর্ট নিয়ে দেখা করতে আসলেন, তখন ডাক্তার সাহেব পুরাতন ডায়াগনোসিসের পাশে ব্র‍্যাকেটে একটা নতুন শব্দ লিখলেন -“Non organic”.

Failure to thrive শব্দটি আমাদের ডাক্তারদের কাছে খুব পরিচিত একটি শব্দ। যখন কোন শিশুর দৈহিক বৃদ্ধি (ওজন/উচ্চতা) তার বয়সের তুলনায় কম হয়ে থাকে তখন সেটিকে বলা হয় Failure to thrive। সাধারনত বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা বা জন্মগত ত্রুটির কারনে শিশুর দৈহিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

কিন্তু কোনরূপ শারিরীক সমস্যা ছাড়াই যখন শিশুর দৈহিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়, তখন সেটিকে আমরা বলি Non organic failure to thrive বা সংক্ষেপে NOFTT। সাধারনত ১৮ মাস থেকে ৩ বছর বয়েসী শিশুদের ক্ষেত্রে NOFTT দেখা যায়।

এখন যেহেতু কথা হচ্ছে নন অর্গানিক বিষয়ে অর্থাৎ  যেখানে শারীরিক কোন সমস্যা নেই, তারমানে সমস্যাটি তাহলে মানসিক। প্রশ্ন আসতে পারে, “এত ছোট বাচ্চার আবার মন কি?” কিন্তু মন বা মনের অসুখ শুধুমাত্র বড়দেরই থাকে এই ধারনাটা সম্পূর্ন ভুল। শিশুরা হয়ত আপনার, আমার মত এই পৃথিবীর জটিলতাগুলো বুঝতে না পারে কিন্তু তারা স্নেহ বোঝে, ভালবাসা বোঝে, আর কোথায় স্নেহ- ভালবাসার ঘাটতি আছে সেটাও বোঝে।

NOFFT হওয়ার পেছনে মূলত এই স্নেহ-ভালবাসার ঘাটতি কিংবা সাইকিয়াট্রির ভাষায় Emotional deprivation দায়ী। আরো একটু বিস্তারিতভাবে যদি বলা হয় তাহলে পরিবার ও বাবা-মায়ের, বিশেষত মায়ের কিছু কিছু ফ্যাক্টর সন্তানের এই Emotional deprivation এর পেছনে কাজ করে। এখানে মা’র কথা আলাদাভাবে বলা হচ্ছে কারন সন্তান জন্মদানের পর তার Primary caregiver এর ভূমিকাটা সাধারনত মা-ই পালন করে থাকেন।

মায়ের এই ফ্যাক্টরগুলোর মধ্যে এক নম্বরে আছে Maternal deprivation- অর্থাৎ শৈশবেই কোন কারনে মা থেকে বিছিন্ন হওয়া (উদাহরণস্বরূপ, মায়ের মৃত্যু অথবা বিবাহ বিচ্ছেদ)। সেই সাথে মায়ের নিজেরই যদি কোন মানসিক অসুস্থতা থাকে, প্যারেন্টিং স্কিলে ঘাটতি থাকে, পারিবারিক কোন জটিলতার কারনে সন্তানের দিকে যথাযথ মনোযোগ দিতে না পারেন অথবা মা নিজেই যদি শৈশবে মানসিক অবহেলার শিকার হয়ে থাকেন তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সন্তানের সাথে তার উপযুক্ত মানসিক সম্পর্কের জায়গাটা তৈরী হবেনা ফলে শিশুটি হবে Emotionally deprived।

একবার ভাবুন তো, আপনার মা সারাদিনে একবারো আপনার সাথে কথা বলেন না, আপনার দিকে তাকান না, আপনার ডাকে সাড়া দেননা কিন্তু দিনশেষে আপনার সামনে একপ্লেট খাবার রেখে যান খাওয়ার জন্য, আপনার কী সেই খাবার খেতে ইচ্ছা করবে? শিশুদের বেলায়ও ঠিক তাই। সারাদিন যে শিশুটির সাথে আপনার কোনরকম মানসিক সংযোগ নেই (emotional deprivation), দিনশেষে সে আপনার হাতে কখনোই খেতে চাইবেনা।

এছাড়া NOFTT হওয়ার ক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকার পাশাপাশি কখনও কখনো শিশুর নিজেরও কিছু ভূমিকা থাকে। কথায় বলেনা, ‘না চাইলে নিজের মাও দুধ দেয়না’?- কথাটি এইক্ষেত্রে আক্ষরিকভাবেই সত্য। সাধারনত শিশুরা বিভিন্ন শব্দ বা অংগভংগির মাধ্যমে মায়ের কাছে তাদের চাহিদা প্রকাশ করে। কিন্তু অনেক শিশুর মধ্যে এই যথাযথ প্রকাশভংগির অভাব থাকে, কেউবা আবার খুবই খিটখিটে বা স্পর্শকাতর, আবার কারো কারো ক্ষেত্রে থাকে আবেগের ঘাটতি। এইসকল শিশুর সাথে স্বাভাবিকভাবেই মায়ের বা প্রাইমারী কেয়ারগিভারের খুব ভাল কোন মানসিক বন্ধন তৈরী হয়না ফলে তারাও পরোক্ষভাবে Emotional deprivation এর শিকার হয়।

এবারে জানা যাক শিশুর উপর NOFTT এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী কী হতে পারে। ইতোমধ্যে শারীরিক প্রভাব সম্পর্কে আমরা জেনে গিয়েছি যে NOFTT তে শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক বিকাশ (উচ্চতা/ওজন) ব্যহত হয়। অর্থাৎ যেই বয়সে যেই অনুপাতে একটি বাচ্চার শারিরীক বৃদ্ধি হওয়ার কথা, এই বাচ্চাদের ক্ষেত্রে সেটি হয়না। সেই সাথে পরবর্তীতে এইসব বাচ্চাদের বিভিন্ন মানসিক সমস্যা যেমন- Learning difficulties, less cognitive ability, behavioural & emotional disturbances অর্থাৎ আচরনগত ও আবেগীয় সমস্যা ইত্যাদি হতে পারে।

“Babies don’t just need food. They need love. Even a newborn baby is able to hear or see.. They pick up far more from the environment than we think they would. So if you are angry, if you are upset and don’t look at or do not talk to your baby, the baby too become sad and a sad baby will never eat properly and lag behind his development.”

কাজেই এরপর থেকে ডাক্তারের কাছে গিয়ে ” বাচ্চা কিছু খায়না” এই কথাটা বলার আগে নিজের মনে একবার ভেবে দেখবেন, সন্তানকে তার শরীরের খাদ্যের পাশাপাশি মনের খাদ্যটাও দিচ্ছেন তো?

>
Scroll to Top