প্যারেন্টিং স্টাইলঃ আপনি কোনটি বেছে নিয়েছেন?

parenting

ধরুন, আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা, পৃথিবীতে আপনার সবচাইতে প্রিয় জিনিস কোনটি?” আপনি হয়ত বলবেন, “আমার মা” অথবা” আমার বাবা” কিংবা “আমার স্ত্রী”।

আবার এসবের কোনটিই না হয়ে উত্তরটা হতে পারে, “আমি নিজে!”

অর্থাৎ আপনি প্রশ্নটির উত্তরে যে কোন কিছুই বলতে পারেন। আমার পক্ষে আপনার উত্তরটি অনুমান করা প্রায় অসম্ভব।

কিন্তু যদি আপনি নিজেই কারো বাবা বা মা হয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে আপনার উত্তরটি অনুমান করা আমার জন্য খুবই সহজ। কারন আমি মোটামুটি নিশ্চিত, পৃথিবীতে আপনি আপনার সন্তানের চেয়ে বেশি ভাল আর কাউকে বাসেন না! আপনি চান আপনার সবটুকু দিয়ে আপনার সন্তানকে সেইভাবে গড়ে তুলতে যেভাবে আপনার সন্তান বড় হলে আপনি তাকে নিয়ে গর্ব করতে পারবেন। সেজন্য আপনি তাকে যেমন ভীষন আদর করেন, তেমনি মাঝে মাঝে একটু আধটু বকুনিও দেন।

আবার সন্তানকে বকা দেয়ার পর নিজেই চিন্তায় পরে যান, আমি কি কাজটা ঠিক করলাম? এই ব্যাপারে কি বকা না দিয়ে অন্য কোনভাবে ওকে বোঝানো যেত? মোটকথা, আপনি আপনার বাচ্চাকে সঠিকভাবে লালন পালন করতে পারছেন কিনা এই বিষয়টি আপনাকে সারাক্ষনই ভাবায়। বাচ্চাকে লালন-পালনের এই বিষয়টির নাম হল “প্যারেন্টিং” বা “অভিভাবকত্ব”। এবং সন্তানের লালন পালন নিয়ে আপনার চিন্তাটি একেবারেই অমূলক না। কারন, পজেটিভ প্যারেন্টিং এর উপরই নির্ভর করে ভবিষ্যতে আপনার সন্তানটি কতটুকু আত্মবিশ্বাসী হবে, আত্মনির্ভরশীল হবে, তার ব্যক্তিত্ব কেমন হবে, সর্বোপরি সে মানুষ হিসেবে কেমন হবে৷

প্যারেন্টিং কি?

প্যারেন্টিং এই ধারনাটা দেন সর্বপ্রথম ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ডায়ানা বামরিন্ড ১৯৮০ সালে এবং পরবর্তীতে ইলানর ম্যাকবি এবং তার কলিগরা মিলে ডায়ানার থিওরীতে আরো কিছু বিষয় সংযোজন করেন। সেই হিসেবে এখনো পর্যন্ত প্যারেন্টিং বলতে সাইকোলজিতে ৪ রকম প্যারেন্টিং কে বোঝানো হয়।

অথরিটেরিয়ান প্যারেন্টিং (Authoritarian Parenting)

অথরিটেরিয়ান প্যারেন্টিং বলতে সোজা বাংলায় আমরা ‘কঠিন শাসন’ বুঝি। এই ধরনের অভিভাবকদের যেকোন কথা হল আইনস্বরূপ। অনেকটা একনায়কতন্ত্রের মত। একনায়কের আইন মানতে যেমন সকল নাগরিক বাধ্য, তেমনি এসব অভিভাবকদের যেকোন কথা বা দৃষ্টিভঙ্গি মানতে তাদের সন্তানরা বাধ্য। সন্তানের ভিন্নধর্মী চিন্তা, সৃষ্টিশীল মনন তাদের কাছে কোন গুরুত্ববহন করেনা।

তাদের সন্তানদের কোন ভিন্নমত থাকতে পারবেনা, ভিন্নমতকে তারা বেয়াদবী হিসেবে বিবেচনা করেন। একারনে যেটা হয় যে এ ধরনের মা-বাবার সন্তানেরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারেনা। তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরনির্ভরশীল হয়ে থাকে। সামাজিক দক্ষতা, বন্ধু তৈরী করা কিংবা অপরিচিত কারো সাথে পরিচিত হওয়ার ব্যাপারে তাদের অদক্ষতা দেখা যায়। এই অদক্ষতার ব্যাপারটা পরবর্তীতে তাদের ব্যক্তি ও চাকুরীজীবনেও প্রভাব ফেলে ফলে এদের অনেকেই বিষন্নতায় ভোগে।

অথরিটেটিভ প্যারেন্টিং (Authoritative Parenting)

অথরিটেটিভ প্যারেন্টিং অনেকটা গনতন্ত্রের মত। এই অভিভাবকগন ‘দৃঢ় কিন্তু নমনীয়’ শাসনে বিশ্বাসী। তাদের সবচেয়ে ভাল দিক হল তারা সন্তানের উপর কোন নিয়ম জারি করার আগে সে সম্পর্কে পূর্ন ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন, কেন এই নিয়মটি জরুরী, না মানলে কি অসুবিধা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে না মানলে পরবর্তীতে কি হতে পারে সবই তারা পরিষ্কার করে বলেন। এবং সন্তানকেও তারা বলার সুযোগ দেন।

তারা সন্তানের ভিন্নমতকে প্রশংসা করেন এবং স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ দেন৷ এর ফলে অথরিটেটিভ বাবা মায়ের সন্তানেরা হয়ে উঠে আত্মবিশ্বাসী, স্বনির্ভর এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে এরা এদের সৃষ্টিশীলতার পরিচয় দিয়ে সফলতা নিশ্চিত করে থাকে।

পারমিসিভ প্যারেন্টিং (Permissive Parenting)

পারমিসিভ প্যারেন্যতিং এর অভিভাবকেরা সন্তানের কোন কিছুতেই না করেন না। সন্তানের কাংখিত আচরনেও যেমন তারা সায় দেন, অনাকাংখিত আচরনেও তাই। তাদের নিজস্ব কোন নিয়ম থাকেনা, সন্তানের ইচ্ছাটাই নিয়ম হয়ে দাড়ায়। স্বভাবতই এর ফলাফলও ভাল হয়না।

এ ধরনের সন্তানেরা ভাল-মন্দ, উচিত-অনুচিতের বিভেদ করতে জানেনা, কোন সামাজিক দক্ষতাও তাদের গড়ে ওঠেনা, এমনকি এদের অনেকেই পরবর্তীতে বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপ বা মাদকাসক্তও হয়ে পড়ে।

আনইনভলভড প্যারেন্টিং ( Uninvolved Parenting)

‘আনইনভলভড’ শব্দটি থেকেই বোঝা যাচ্ছে এ ধরনের অভিভাবকগন সন্তানের কোন কিছুর সাথেই জড়িত না। পারমিসিভ প্যারেন্টস রা যেমন সন্তানকে সকল কিছুতে ছাড় দেন, মাত্রাতিরিক্ত আহ্লাদে ডুবিয়ে রাখেন, এরা সেটাও করেন না। অর্থাৎ, সন্তানকে আদর বা শাসন কোনটাই তারা করেন না। তাদেরকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় তাদের সন্তান এই মূহুর্তে কোথায় আছে, কি করছে, তারা বলতে পারবেন না।

মোটকথা তাদের সন্তানের কোন কিছুতেই তারা ইনভলভড না, কোন কিছুতেই তাদের কিছু আসে যায়না। এদের ছেলেমেয়েরা পরবর্তী জীবনে ভীষন রকমের স্বার্থপর, নিষ্ঠুর, সামাজিক দক্ষতায় একেবারেই শূন্য এবং কেউ কেউ বিভিন্ন অসামাজিক ও অপরাধমূলক কার্যকলাপ, মাদকাসক্তি ইত্যাদিতে জড়িয়ে পড়ে।

আদর্শ প্যারেন্টিং কোনটি?

উপরের আলোচনা থেকে স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে, তাহলে কোন ধরনের প্যারেন্টিং আদর্শ? বা কোন ধরনের প্যারেন্টিং আপনি ফলো করবেন?

বস্তুত, অথরিটেটিভ প্যারেন্টিং কেই সাইকোলজিতে আদর্শ প্যারেন্টিং হিসেবে ধরা হয় এবং এর পক্ষের কারনগুলোও খুবই যুক্তিযুক্ত৷ কিন্তু সাইকোলজিতে এটাও বলা হয়ে থাকে যে, কোন একজন অভিভাবকের পক্ষে সারাজীবন কোন একটা নির্দিষ্ট প্যারেন্টিং ফলো করা সম্ভব নয়।

একজন অথরিটেরিয়ান বা অথরিটেটিভ প্যারেন্ট ও ক্ষেত্রবিশেষে পারমিসিভ হয়ে যেতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, আপনার সন্তান যার আইস্ক্রিম ভীষন পছন্দ, তাকে আপনি কখনোই আইস্ক্রিম খেতে দেন না কারন আইস্ক্রিমের ঠান্ডায় তার গলায় ইনফেকশন হয়ে যায় (অথরিটেটিভ প্যারেন্টিং), তাকেই হয়ত পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করার উপহারস্বরূপ একটি আইস্ক্রিম খেতে দিলেন (পারমিসিভ প্যারেন্টিং)।

অর্থাৎ জীবনে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে আপনি ভিন্ন ধরনের প্যারেন্টিং স্টাইল গ্রহন করতে পারেন।

আবার দেশ, জাতি বা সংস্কৃতিভেদেও প্যারেন্টিং স্টাইল আলাদা হয়ে থাকে। যেমন, বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিবারেই এখনো অথরিটেরিয়ান প্যারেন্টিং দেখা যায় যেখানে কিনা আমেরিকার প্রায় প্রতিটা ঘরেই অথরিটেটিভ প্যারেন্টিং বিদ্যমান।

সবশেষে সমাজ, পরিবেশ ও পরিস্থিতি অনুযায়ী যে প্যারেন্টিং স্টাইলটিই আপনি গ্রহন করুন না কেন, আপনার চূড়ান্ত লক্ষ্য যেন হয় এটাই যে আপনার সন্তানকে একজন স্বনির্ভর, আত্নবিশ্বাসী, পরোপকারী এবং সামাজিক দক্ষতায় পারদর্শী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।

  • 15
    Shares
  • Excellent please keep ongoing

  • >
    Scroll to Top